একজন নিশিউঁকির নিঃশব্দ স্বপ্ন

সেদিন প্রচণ্ড তুষারপাত হচ্ছিল । তখন ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ । চারিদিকে বরফের উৎসব । হোক্কাইডো দ্বীপটা যেন সাদা বরফ চাঁদরে ঢেকে আছে ।কিছুক্ষণ পর পর ঘূর্ণি বাতাস । দরজা খুলে বাইরে তাকানোর উপায় নেই । দিন টা ছিল শনিবার । ছুটির দিন । একটু অলস মন আর এক কাপ ব্লাক কফি নিয়ে আমি অনলাইনে পত্রিকা পড়ছিলাম । পৃথিবীর সব মানবিক বিপর্যয়ের খবর গুলো আমাকে একটু উদাস করে রেখে ছিল । আমি মনটা কাজে বসাতে পারছিলাম না । কেমন একটা অস্থিরতা মনের কোথাও দুমরে মুছরে দিচ্ছিল । মনের এই অস্থিরতা কে ভুলে থাকতে এবং সময় টাকে সুন্দর করে উপভোগ করার জন্য চিন্তা টা কে অন্য দিকে নেওয়ার চেষ্টা করলাম ।

তাই ভালো কোন বই কিংবা পত্রিকার বিষয় খুঁজছিলাম । প্রতিটা পত্রিকা জুড়ে শুধু ভাঙা চূড়ার বিষয় গুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে । উৎসাহ পাওয়ার মতো কিছুই যেন পাচ্ছিলাম না । কিন্তু আমি হাল ছাড়লাম না । বেশ মনোযোগ সহকারে এমন কিছু বিষয় খুঁজছিলাম যা আমাকে উৎসাহ দিবে । আমি যেন নিজেকে আত্মবিশ্বাসী ভাবতে পারি । আমার ভিতরের মানবিক বোধ গুলোকে আরও বেশি সচেতন এবং সাহসী করে তুলবে । সময়টা সকাল ফুরিয়ে মধ্যাহ্ন ছুঁই ছুঁই করছে । হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠলো । আমি একটু অবাক হলাম । কারন বাইরে তখন তুষারপাত । এই সময়ে কেউ প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকে বের হয় না । আমি একটু অলস ভঙ্গিতে কফি হাতে নিয়েই দরজা খুললাম ।বাইরে থেকে প্রচণ্ড বাতাসের ধাক্কা ।খুব তুষারপাতের কারনে কিছুই দেখা যাচ্ছিলোনা । ঘূর্ণি বাতাসে তুষার গুলো এলো মেলো ভাবে এক অদ্ভুত ধোঁয়াটে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে । আমি ভাল ভাবে তাকাতে পারছিলাম না । দুজন জাপানিজ মহিলা ।
কয়েক সেকেন্ড এর মধ্যে একটু যেন বাতাস থামল ।আমি তখন জাপানিজ ভাষা জানি না । আমি এটা ও নিশ্চিত না যে তারা ইংরেজি পারে কিনা । একটু সামান্য দ্বন্দ্ব মনের মধ্যে কাজ করছিল। তাই আমি তাদের ইশারা ইঙ্গিত করে বাসা দেখিয়ে বুঝালাম ভিতরে আসতে । আমার ইশারা ইঙ্গিত ভাষা দেখে মজা পেয়ে হেঁসে দিল ।ওরা আমার বাসার ভিতরে ঢুকল খুব লাজুক ভঙ্গিতে । ওদের চোখে খুব কৌতূহল । আমি স্বাভাবিক করার জন্য কফি মগ দেখিয়ে বুঝালাম কফি খাবে কি না । ওরা হাসল । আমি দুই কাপ কফি তৈরি করলাম ।খুব অল্প সময়ের মধ্যে কফি আন্তরিক ভাবে তাদের হাতে তুলে দিলাম । ওরা যেন ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে তা ওদের হাঁসি দেখে বুঝা যাচ্ছিল । এখানে অনেক শিক্ষিত জাপানিজ ইংরেজি জানে না কিংবা জানলেও ওরা অন্য ভাষায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না । কিছুটা সময় এমন করেই গেলো । আমরা পাশা পাশি বসে চুপ চাপ কফি খাচ্ছিলাম । হটাৎ একজন ইংরেজিতে জানতে চাইলো তুমি নিশ্চয়ই এশিয়ার দেশ বাংলাদেশ থেকে এসেছ?
আমি তো হতবাক । তার বুদ্ধি মত্তা আমাকে আকর্ষণ করলো । খুব স্বাভাবিক ভাবে আমাকে দেখে অনেকে বুঝতে পারে না । কেউ ভাবে আমি ইনডিয়ান ,কেউ পাকিস্তানি ,কেউ বা ভাবে নেপালি অথবা অন্য কোন
দেশের ।আমি যেন একটু চমকে গেলাম । মনের মধ্যে প্রচণ্ড আনন্দ অনুভব করলাম ।
আমি ও ইংরেজিতে প্রশ্ন করে জানতে চাইলাম তুমি কেমন করে বুঝলে আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি ?
সে খুব আন্তরিকতা নিয়ে বলল ,তোমার আতিথেয়তা দেখে।
আমি ও লজ্জা পেলাম এবং বললাম ,এটা বেশি কিছু নয় !আমাদের দেশের সংস্কৃতি ই এমন অতিথি দেখলে সব মানুষ খুশি হয়।
তারপর তারা দুজনেই দুজনের পরিচিতি দিল। এক জনের নাম নাতালি নিশিউকি অন্য জনের নাম এমিলি সাইতো ।তারা দুজনেই খণ্ডকালীন খ্রিস্টান ধর্মের প্রচারক। কাছের কিংডম হল থেকে এসেছে।সপ্তাহের দুই দিন তারা মানুষের বাসায় বাসায় ধর্ম প্রচারনার কাজে যায় । একটি ম্যাগাজিন আমার হাতে দিয়ে বলল ,তুমিও আসতে পারো ।পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানবিকতা নিয়ে অনেক বিষয় আছে তুমি পড়ে দেখতে পারো ।
আমি বললাম ,আমি মুসলিম । তবে আমি তোমার ম্যাগাজিন পড়বো । নিশি উকি বলল আমি আগেই বুঝতে পেরেছি তুমি উদার মুসলিম । ভাল মুসলিম ।
আমি একটু অবাক হলাম । ওকে জিজ্ঞেস করলাম ,তুমি কিভাবে বুঝলে আমি মুসলিম ?
নিশিউকি আমার রুমে রাখা জায়নামাজ দেখিয়ে বলল, আমি অনেক বছর আগে এই হক্কাইডো বিশ্ব বিদ্যালয়ের এক বাংলাদেশি মুসলিম পরিবার কে চিনতাম। তাদের সংস্কৃতি আমি দেখেছিলাম। শুধু তাই নয় আমি বাংলাদেশ নিয়ে নিজে নিজে ইন্টারনেট এ পড়াশুনা করে বাংলাদেশের যুদ্ধ ,ইতিহাস, সংস্কৃতি সম্পর্কে জেনেছি।
আমার যেন নিশিউঁকি কে নিয়ে এক অদ্ভুত আগ্রহ তৈরি হল মনের মধ্যে ।জাপান একটি ধর্ম হীন দেশ । এখানে কাজের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নিয়ম নীতি মেনে চলাই ধর্ম । এখানে আগে অনেকে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিল । কিন্তু কেউ কেউ খ্রিস্টান ,ইসলাম ,কিংবা অন্য যে কোন ধর্মে ও ধর্মান্তরিত হয়েছে । তবে বেশিরভাগ মানুষ ধর্মহীন এবং স্বাধীন ।

এমন করেই শুরু হয় নিশিউঁকির সাথে আমার পরিচয় । প্রায় ছুটির দিন গুলোতে নিশিউঁকি আমার বাসায় আসে । কথা হয় দেশ ,জীবন সংস্কৃতি নিয়ে । প্রকৃত পক্ষে সে একজন কলেজ শিক্ষক । আমি তাকে বাংলাদেশি খিচুড়ি ,ইলিশ মাছ আর আলু ভর্তার সাথে পরিচিত করি । তবে সে সময় থেকে অনেক জাপানিজদের সাথে মিশে বুঝতে পেরে ছিলাম ওরা খাবার খুব আয়োজন করে খায় ।খুব উপভোগ করে । যে কয়দিন আমার বাসায় এসেছে সেই কয়দিন দেখেছি খাবার খাওয়ার আগে খুব সুন্দর করে প্রার্থনা করতে । এখন পৃথিবীতে অনেক ধর্মের অনেক ধার্মিক দেখা যায় । কিন্তু ধর্মের সৌন্দর্য শান্তি, বিশ্বাস ,ভালোবাসা যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে ।
সারা পৃথিবীতে ধর্ম কে কেন্দ্র করে যুদ্ধ সংস্কৃতি যেন বেড়েই চলছে । মানব পৃথিবীতে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ,শ্রদ্ধা মানবিকতা সত্যিই অসহায় । আমি নিজে মানুষের সঙ্গ পছন্দ করলেও কখনও কখনও কিছু কিছু সময় মিশ্র চিন্তার মানুষ কে এড়িয়ে থাকি । একজন ভয়ংকর মানুষের চেয়ে গভির নিরবতা এবং একাকীত্ব ও অনেক সুন্দর । যদিও এখনকার অস্থির সময়ের পৃথিবীতে ভাল এবং মন্দ বুঝাও অনেক কঠিন । নতুন যে কোন কিছু আমাকে আকর্ষণ করে । নতুন মানুষ ,নতুন সংস্কৃতি ,নতুন চিন্তা ভাবনা আমাকে আন্দোলিত করে । কয়েক মাস নিশিউঁকির সাথে আমার দেশ, সংস্কৃত ,ইতিহাস, ধর্ম এবং বিচ্ছিন্নতাবোধ নিয়ে অনেক কিছু অনেক বিষয় নিয়ে কথা হয় ।একটা নির্ভেজাল সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠলো নিশিউঁকির সাথে আমার । কখনও আমাকে বাসায় না পেলে দরজায় হানি চকোলেট আর ধর্মীয় শান্তির বানী সম্বলিত ম্যাগাজিন ঝুলিয়ে দিয়ে
যায় । সেই সাথে কখনও কখনও ছোট ছোট চিরকুট ।সেখানে লেখা থাকে ভালোবাসা ,বন্ধুত্ব ,মানবিকতা নিয়ে দুই চার লাইন কবিতা ।আমি দিনে দিনে একটা শ্রদ্ধাবোধ অনুভব করি ।সে আমাকে তার ইমেইল ঠিকানা দেয়। আমি তাকে ফেসবুকের কথা এবং বন্ধুত্তের কথা বললাম ।সে প্রকাশিত পৃথিবীর একজন হতে নারাজ । নিভৃত পাহাড়ি জীবনই যেন তাদের বৈশিষ্ট্য। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম তার বাড়ি তেইনে পাহাড়ের মাঝে । সে পাহাড়ে আছে আরেক বসতি । আরেক জীবন সংস্কৃতি । আছে বিদ্যালয় ,হাসপাতাল ,বৃদ্ধাশ্রম ,পার্ক, বিনোদনের অনেক কিছু । আমি ওর মুখে শুনে অভিভূত হই । সেই তেইনে পাহাড়ে যাওয়ার জন্য আমার মন আনচান করতে লাগলো । আমি তাকে বুঝতে দিলাম না । তাকে বুঝানোর আগেই সে আমাকে দাওয়াত করলো তার সেই তেইনে পাহাড়ে ।কিন্তু তেইনে পাহাড়ে যেতে বাঁধা হল শীতকালীন তুষারপাত । আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম যে নতুন কিছু জানতে মাঝে মাঝে ঝুঁকি নিতে হয় । আমি তার কাছে জানতে চাইলাম গাড়ি চালনায় তার দক্ষতা কেমন?
সে হাসল । সে লাজুক হাসির সাথে আত্মবিশ্বাস নিয়ে জানালো ,জাপানিজরা গাড়ি ভাল চালায় ।তুমি চাইলে তোমাকে নিয়ে যেতে পারি পরের কোন ছুটির দিনে ।আমি তার কাছ থেকে জেনে নিলাম বাসায় কে কে আছে । সে জানালো মা,বাবা,সে আর তার ছোট বোন । একটি ভাই আছে কিন্তু সে টোকিও তে থাকে পরিবার নিয়ে । নিশিউঁকির বয়স অনুমান করার চেষ্টা করে বুঝলাম হয়তো সে একা ।হোক্কাইডোতে অনেক অনেক একা মানুষ আছে । যারা বিয়ে করেনি।কিংবা বিয়ে হয়েছিল ।হয়ত মন ভাঙ্গা নিঃসঙ্গ মানুষ ।আমরা আমাদের সংস্কৃতিতে জীবন বলতে যা বুঝি ওদের কাছে জীবনের ছবি আরেক রঙে আঁকা । ওরা জীবন কে গভীর ভাবে উপলব্ধি করে ।তবে কাজের মধ্য দিয়ে ।

হেয়ালিপনা শব্দটা হয়তো জাপানিজ অভিধানে নেই । জাতিগত ভাবে সবাই সিরিয়াস ।তারপর এক শনিবার । আমি বাংলাদেশি প্রস্তুতি নিলাম । নিজের হাতে মিষ্টি ,পায়েস ,মুরগির রোস্ট আর বাদাম পোলাও রান্না করলাম । সেদিন তুষারপাত ছিলনা তবে হালকা শৈত্য প্রবাহ । চারিদিকে বরফে ঢাকা পথ। এই সময় গাড়ি চালনা অনেক বিপদ জনক ।জানিনা নিশিউঁকি কেন এত বেশি আন্তরিক হয়ে গেল আমার সাথে!আমার মনের মধ্যে আনন্দের সাথে একটু একটু ভয় ও কাজ করছিল । সে কথা মত সকাল নয়টায় চলে এলো । জাপান এ সকাল নয়টা কেমন সকাল না । কারন এখানে ভোর হয় অনেক আগে ।গাড়ি চলছে । কিতাকু ওয়ার্ড ছেড়ে হাচিকেন ,তারপর হাসসামু নামের একটা জায়গা। সেখান থেকেই দেখা যায় পাহাড় তেইনে ।আমি একটু স্বাভাবিক থাকার জন্য কথা শুরু করলাম ।

তোমার নিশিউঁকি নামের অর্থ কি ?
জাপানিজ নিশি অর্থ পশ্চিম আর উঁকি হল তুষার ।পুরো অর্থ পশ্চিমের তুষার ।
আমি মুগ্ধ হয়ে বললাম ,বাহ! খুব কাব্যিক অর্থ ।
সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো ,তোমার নামের অর্থ কি?
আমি বললাম ,নুরুন নাহার আরবি শব্দ নুরুন অর্থ হলি এবং নাহার অর্থ লাইট অফ দ্যা ডে ।
সে হেঁসে উঠল্।তারপর গাড়িটা সামনের ডান দিকে সামান্য বেঁকে একটু জোরে চালাতে চালাতে বলল,তুমি পাশে বসে আছো বলেই আজকের দিনটা বেশি উজ্জ্বল ।
আমি ও হেসে দিলাম । সে আমাকে বলল ,তোমার পরিচিত হয়ে আমার মন আরও অনেক বছর আগে ফিরে গেছে । কিন্তু আমি সত্যি ভীষণ খুশি । আমি কিছুই বললাম না । সে ই শুরু করল ।
ইউসুফ ছিল হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ । ক্যান্সার জীবাণু নিয়ে গবেষণা করতেই সে এখানে এসেছিল পাঁচ বছরের জন্য । আমি তখন ওর প্রফেসর এর অফিস সহকারী হিসাবে দুই বছরের জন্য নতুন চাকুরিতে ঢুকি । প্রতিদিন সে মধ্যাহ্ন ভোজ করার আগে একটি পুরনো জায়নামাজ বিছিয়ে যহুর নামাজ পড়ত । আমি তার নিয়ম করে নামাজ পরতে দেখে অভিভুত হই । আমি খুব মুগ্ধ হয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে তার নামাজ পড়া দেখতাম ।জানি না কখন ইউসুফ এর জন্য আমার মন হারিয়ে গিয়ে ছিল । প্রায়ই বিষয়টা ইউসুফ বুঝে ফেলত এবং সামান্য হাসত । আমি একদিন টার্কিশ দোকান থেকে একটি জায়নামাজ কিনে আনি। ওর পুরনো জায়নামাজ সরিয়ে নতুন জায়নামাজ রাখি । আমি অপেক্ষা করতে থাকি একটি ধন্যবাদ পাওয়ার জন্য ।কিন্তু দুই সপ্তাহ চলে গেল । ইউসুফ কোন ধন্যবাদ দিল না । সে নির্বিকার ভাবে ওই জায়নামাজে নামাজ পড়ে যাচ্ছে ।
আমার মন অস্থির হল এবং ওর অনুভূতিতে ছুইয়ে দিতে একটা চিরকুটে লিখে দিলাম ,এই ম্যাট টা সুন্দর ।এটা কি বাংলাদেশি ?
তারপর দুই দিন পর । হঠাৎ একজন আন্ডার গ্রাজুয়েট ছাত্র এসে বলল, ওই ম্যাট টা টার্কিশ ।ইউসুফ সান তোমাকে বলতে বলেছে । আমি বোকা হয়ে গেলাম । কিন্তু ইউসুফ এর সাথে আমার কেমন করে বন্ধুত্ব করব এই ভাবনা নিয়ে মাথায় সব সময় ঘুরপাক খেত ।একদিন প্রফেসর আরও একজন প্রফেসর কে ইউসুফ সম্পর্কে বলছিল যে তার মা ক্যান্সার এ আক্রান্ত । আমি বিষয় টা শুনি । আমার মন দুঃখিত হয় । আমি আর আগের মতো আচরন করিনা । নিজেকে সংযত করলাম । এভাবে প্রায় ছয় মাস । হঠাৎ একদিন আমি ভীষণ মনোযোগ দিয়ে একটি অফিসিয়াল চিঠি টাইপ করছিলাম । বুঝলাম কেউ আমার সামনে ।
ইউসুফ আমার সামনে । হাসোজ্জল মুখে সে বলল ,আমি বিশ্ব বিদ্যালয়ের বাসা পেয়েছি । আগামি সপ্তাহে ল্যাব এর সবাইকে নৈশ ভোজ এর দাওয়াত করেছি । তুমি ও আসলে খুশি হবো ।
ইউসুফের দাওয়াত আমাকে আনন্দে ভাসিয়ে দিল । এই কয়দিন আমি যে কষ্ট পাচ্ছিলাম সব ভুলে গেলাম ।

খুব মনোযোগ সহকারে নিশিউঁকি অতিত বর্ণনা করছিল । আর গাড়ি চালাচ্ছিল । আমি শুনে যাচ্ছিলাম । সে আমার নিরবতা দেখে জিজ্ঞেস করল,তুমি অবাক হচ্ছো ?
আমি বললাম ,কিছুটা ! তবে এটা আমার চিন্তার মধ্যে ছিলনা । কারন আমি এখানে তেমন বাংলাদেশি দেখিনি ।
ততক্ষণে আমরা তেইনে পাহাড়ের মাঝে চলে আসছি । সে এক বিশাল আয়োজন । মাত্র তিন জন মানুষের জন্য এতো কিছু । জাপানিজ আতিথেয়তা নিয়ে অনেক বদনাম আছে । ওরা সময়ের অভাবে কাউকে বাসায় দাওয়াত করে না । রেস্টুরেন্ট এ খাওয়ার পর যার যার বিল সে সে দেয় । কিন্তু ওদের আতিথেয়তা দেখে আমার ভিতরে প্রচলিত ধারনা ভেঙ্গে গেল । তেইনে পাহাড়ের মাঝে তিন তলা বাড়ি । দুতলায় ওর মা বাবার সাথে দেখা করলাম । নিচ তলায় এমিলি ,আমি আর নিশিউঁকি বিশাল অতিথি রুমে পুরনো ঐতিহ্যবাহী টেবিলে নিচে বসে মধ্যাহ্ন ভোজ করলাম । সামুদ্রিক খাবার হিজিকি,কিসুই, গবো নামের এক খাবারের সাথে চিকেন ফ্রাই ,অনেক রকমের ফলের ডেসার্ট ,আর সাকুরা সুপ টা আমাকে বেশি মুগ্ধ করল । আমার খাবার গুলো ওর মা টেবিলে রেখে ছবি তুলল কারন টোকিও তে তাঁর ছেলে কে দেখাবে ।

যথারীতি নিশিউঁকির পরিবারের সবাইকে এবং এমিলি কে বিদায় জানিয়ে আমি গাড়িতে উঠলাম বাসায় ফিরব বলে । তেইনে পাহাড় এর বরফ কেটে গাড়ি নিচে নামছিল । আমি আমার ভিতরের কৌতূহল দমিয়ে রাখতে পারছিলাম না । অনেকটা পথ নিচে নামার পর আমি প্রশ্ন করলাম ,তারপর কি হয়েছিল ?
সে আমার দিকে তাকাল না । সামনে চোখ রেখেই স্বাভাবিক ভাবে বলল ,পরের দুই তিন বছর একটা সুন্দর বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক ছিল আমাদের মধ্যে । যেখানে গভীর ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা বোধ ও ছিল । কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ধর্ম বাধা হয়ে দাঁড়ালো । আমার তরফ থেকে না থাকলেও ইউসুফ এর মা মানতে পারছিল না আমাকে ।
অনেকক্ষণ সে কোন কথা বলল না । ও হয়তো আবেগ প্রবন হয়ে গেছে ।আমিও চুপচাপ রইলাম । বাইরে সূর্যের ম্লান হাসি । একটু শৈত্য প্রবাহের ছোঁয়া অনুভব করলাম । বাইরে তাকালে চারিদিকে বরফে ঢাকা সাদা পৃথিবী । আমার দুচোখ পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলো ।গাড়ি নতুন বাঁক নিল পুরনো পথে কিতাকু ওয়ার্ডের দিকে ।
সে আবার নিজ থেকেই বলল ,মৃত্যু নিশ্চিত ক্যান্সারে আক্রান্ত মায়ের কথা চিন্তা করে ইউসুফ ধর্ম কে সামনে রেখে তার সব ভালোবাসা আর অনুভুতি পৃথিবীর কোন গোপন যায়গায় লুকিয়ে রাখলো ।কোন অভিযোগ
নেই । মানুষের মধ্যে যিনি এই ভালোবাসা নামক অনুভুতি তৈরি করেছেন এবং মানুষের জীবন সুশৃঙ্খলপূর্ণ রাখতে ধর্ম নামক যে বিধান দিয়েছেন তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ।আমি সেই অনুভুতিকে সম্মান জানিয়ে আমৃত্যু মানুষ কে ভালোবেসে এবং ঈশ্বরের সেবা করে যেতে চাই। পৃথিবীর সকল মানুষের জীবন শান্তিময় হোক ।
আমি মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছিলাম । এর মধ্যেই গাড়ি আমার বাসার সামনে এসে ধামলো ।বাইরে বের হয়ে তাকে ধন্যবাদ দিলাম । সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল এবং ইশারা করে বিদায় জানাল ।
নিশিউঁকি ওর গাড়ি নিয়ে চলে গেল ।কিন্তু ওর নিরব দুটো চোখ আমাকে বেঁচে থাকার আরেক নিঃশব্দ জীবনবোধের গল্প বলে গেল ।