এক টুকরো অভিমান

image_pdf

–ন বাবা কি সত্যিই পারে, মায়ের শূণ্যতা পূরণ করতে ?!

তবে, তরীর কোন আবদার তিনি অপূর্ণ রাখেন নি।তবে, গতপরশু মেয়ের অদ্ভুত ইচ্ছেটা তাকে খানিকটা বিস্মিত করলো।তরী তার জীবনে মোট কতবার রিক্সাতে উঠেছে, তা হাতে গুণে প্রথমে বজলুর সাহেবকে বলতে শুরু করলো।তাছাড়া প্রতিদিন ইউনিভার্সিটিতে যাবার সময় ড্রাইভার মজনু মিয়ার বকবকানিতে, সে রীতিমতো অস্হির হয়ে পড়ে।তার দৃষ্টিতে, তরী এখনো হয়ত দশ কিংবা বারো বছরের একটা বাচ্চা মেয়ে।তাই, সব কথায় তাকে অহেতুক জ্ঞান বন্টনের অপচেষ্টা ইদানিং সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।অথচ, প্রতিদিন রিক্সায় যাওয়া গেলে, দিনগুলো কি এমন বৈচিত্র্যহীন হতো !

সকালের ঝলমলে রোদ অথবা, ফুটপাতের পথচারীদেরও একটু কাছের কেও বলে মনে হতো।সত্যিই কি মনে হতো ! কাছের মনে না হলেও, দূরের মানুষ হয়ে তারা হয়ত থাকতো না।তরী নিজের প্রশ্নের উত্তর নিজেই দিয়ে যাচ্ছিলো।গাড়ির স্বচ্ছ জানালাটা যেন চিরচেনা এই শহরটাকে তার কাছ থেকে আড়াল করে রাখতে চায়।বজলুর সাহেবের মেয়ের কথা শুনে হাসি পেল।যদিও, তিনি তা একদমই মেয়েকে বুঝতে দিলেন না।টেবিলে রাখা চশমাটা হাতে নিয়ে, রুমাল দিয়ে গ্লাসটা মুছে নিলেন।
তরীর কথা শুনলে আসলেই যে কারো মনে হবে- মেয়েটা এখনো ছোটই রয়ে গেছে।একটু বেশি নিজের কল্পনার জগতে থাকতে ভালবাসে।অথচ, তরীর এমন আচরণের পেছনে যে কিছুটা তার নিজেরও ভূমিকা রয়েছে ; সে ব্যাপারে বজলুর সাহেব বোধহয় অনবগত।
বাবার অনুমতি নিয়ে তরী আজ সারাটাদিন রিক্সা নিয়ে ঘুরেছে।সাথে ছিল প্রিয় বন্ধু অরণ্য।যদিও, অরণ্যের আজ সারাদিন তরীর মতো করে প্রফুল্ল আমেজে কাটেনি।নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে অরণ্য।বাস কিংবা রিক্সায় এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করা, তার কাছে আর দশটা দিনের থেকে ভিন্ন কিছু নয়।তারওপর, তরীর পাগলামোর কারণে তাকে ক্লাসটাও মিস দিতে হলো।মিথিলা হয়ত কাল ওর দাদাবাড়ি খুলনায় যাবে।এরপর ওর সাথে এক সপ্তাহ দেখা হবার সুযোগ মিলবে না অরণ্যের। জ্বালাতনের জন্য এই দিনটা বরাদ্দ রাখার কি দরকার ছিল তরীর !

পাশাপাশি রিক্সায় অনেকটা সময় দুজনে বসে থাকলেও নীরবতার মোচন ঘটলো না।গোধূলির মায়ায় তরীর মনটা মেঘের মতোই ভেসে বেড়াচ্ছিলো।একটুপর অবশ্য তার গোমরা মুখো অরণ্যের দিকে নজর পড়লো।
– আপনি কি পিন পতন নীরবতা ভাঙ্গিয়ে কিছু বলবেন, স্যার ?
বেখেয়ালি অরণ্য ডুবে ছিলো মিথিলার ভাবনাতে।তাই তরীর কথাগুলো তার কর্ণকুহরে পৌঁছাতে সক্ষম হলো না।তরী আঙ্গুল দিয়ে আলতো করে টোকা দিলো অরণ্যের কপালে।
– এভাবে মুখ গোমরা করে না থেকে, তোর মিথিলাকে এতদিনেও মনের কথাটা বলছিস না কেন !?
অরণ্যের চোখে বিরক্তি।
– সবসময় ওকে ‘ তোর মিথিলা ‘ বলে সম্বোধন করবি না, তরী।মেয়েটার নাম মিথিলা, তোর মিথিলা নয়।
মিথিলা ওমনি অরণ্যের কাঁধ চাপড়ে ধরে বললো,
– এই শোন, আমার সাথে একদম মেজাজ দেখাবি না।
– তোর হাত – পা ছোড়াছুড়ির অভ্যেসটা কবে যাবে !
তরী আদরের ভঙ্গিতে অরণ্যের গালটা টিপে ধরলো।
– ছাড়, ঢং দেখাবি না।
– আহারে ! আজ মনে হয়, সকাল থেকেই তোর মনটা মিথিলার কাছেই পড়ে ছিলো।আসলে ভুলটা আমারই।কেন যে বুঝতে পারলাম না ! এখন তোর ছুটি।তুই বাড়ি চলে যা, কাল দেখা হবে।
অরণ্য তাতেও রাজি হলো না।ধানমন্ডির গলিগুলো এ সময়টায় মাঝেমধ্যে বেশ নিরিবিলি থাকে।তাছাড়া তরী এমনিতেও একা চলাচল করতে অভ্যস্ত নয়।

মজনুমিয়া বিরক্তিকর হলেও, বিশ্বস্ত লোক।তাই আগের ড্রাইভারদের কিছুদিন পর পর বদলানো হলেও,মজনুমিয়ার ক্ষেত্রে তরীর বাবাকে সেকথা ভাবতে হয়নি।আর, তরীকে এভাবে রেখে সে নিজেও নিশ্চিন্তে বাড়িতে যেতে পারবে না।অরণ্যের আপত্তির কারণ জেনে তরীর হাসি পেল।
– আমি ছোটবেলা থেকে এখানে আছি অরণ্য।আর একটা গলি পরে আমাদের বাড়ি।কি এমন হবে ! এইটুকু সময় আমাকে প্রকৃতির সাথে একটু একা কাটাতে দে, প্লিজ।
অরণ্য হা-সূচক মাথা নাড়ালো।
– তোর পাগলামো আর গেল না।আচ্ছা, আমি গেলাম।
তরী একাকি হাঁটছে, এলোপাথাড়ি হাঁটা।উদ্দেশ্যহীন ভাবলেশ হাঁটাও বলা যেতে পারে।ওদের বাড়ির গলিটা ছেড়ে, পাশের একটা গলিতে ফুটপাত ধরে হাঁটছিল।একটু সামনে যেতেই দেখলো, অনেকগুলো গোলাপি রঙের কাঠগোলাপ পড়ে আছে।তরী দুটো ফুল কুড়িয়ে নিলো।পাশেই কাঠগোলাপ গাছটা।এতক্ষণ হাঁটার পর তৃষ্ণার্ত তরী গাছটার পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো।হঠাৎ পেছন থেকে একটা ছেলে কোন কিছু না বলেই, তরীর হাতের ব্যাগটা হ্যাঁচকা টান দিয়ে সামনে দৌড় দিলো।তরীর চিৎকার শুনে কিছু লোক ছেলেটির পিছু নিলো।তরী নিজেও পেছন পেছন দৌড়াতে লাগলো।ছেলেটি ভয়ে ব্যাগটা অন্য একজনের হাতে ছুড়ে দিলেও, গণপিটুনি থেকে রেহাই পেল না।যে লোকটি তরীর ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তরী এবার তার দিকে এগিয়ে গেল।
– লজ্জা করে না, আপনাদের !
– আপনি ভুল করছেন।ওই দেখুন, আমার বড় ভাই ওখানে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছেন।উনি পেশায় একজন পুলিশ অফিসার।আমরা ভদ্র পরিবারের ছেলে।
– একদম চুপ, ফাজিল কোথাকার।
তরী তেড়ে এলো লোকটির দিকে।অপরদিকে যিনি ফোনালাপে ব্যস্ত ছিলেন, এবার তিনি তরীর আক্রমণাত্মক ভঙ্গি দেখে তড়িঘড়ি করে এগিয়ে এলেন।
– আরে আপু, করেন কি ! থামুন বলছি।

Be the first to reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *