গলঃ রহস্যময়ে ঘেরা গল্প // সবেমাত্র ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি

image_pdf

 

 

সবেমাত্র ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি। বেশ নিরিবিলি একটি জায়গায় আমাদের ভার্সিটি ক্যাম্পাস। শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরে হওয়ায় এখানকার পরিবেশটা যানবাহনের কোলাহল মুক্ত। ভার্সিটি থেকে একটু পূর্ব দিকে স্টেডিয়াম ঘেঁষে অনেক দূর চলে গেছে রেললাইন। রেলপথের চারপাশের সবুজ-শ্যামল সৌন্দর্যময়ী পরিবেশ মন কেড়ে নেওয়ার মতো। ভার্সিটি কিংবা ভার্সিটির মানুষগুলোর প্রতি আমার মায়া কাজ করতো না, কিন্তু রেলপথের সৌন্দর্যতা আমাকে ঠিকই আকর্ষন করতো। ভার্সিটিতে সেই সময় তেমন একটা ক্লাস হতো না। রেলপথের অপার সৌন্দর্য স্বীয় হৃদয় কুঠুরিতে অনুভব করার জন্য আমিও ছুটে যেতাম সেখানে। বিকেল বেলা যখন সূর্যদেব ক্ষীণ আলো দান করতো ঠিক তখনই সেখানকার সৌন্দর্যটা হয়ে উঠতো আরও মনঃমুগ্ধকর। প্রায় প্রতিদিনই লক্ষ্য করতাম, রেলপথের দুই ধার ঘেঁষে কপোত-কপোতীর মেলা। শহুরে মানুষের কোলাহল আর চোখকে ফাঁকি দিয়ে এরা এখানে এসে প্রেমলীলায় মেতে ওঠে। আমি অবশ্য কখনোই এসব জিনিস নিয়ে মাথা ঘামাতাম না, পিতৃদেবের হুকুম ছিল এসবের মধ্যে যেন না জড়াই। তাই তো আমার তেমন কেউ ছিল না, যদিও দু-তিনজন ছেলে বন্ধু ছিল। কপোত-কপোতীর জমা ভিড় থেকে কিছুটা দূরে একা বসে থাকতাম। মাঝে মাঝে আড় দৃষ্টিতে ওদের দিকে তাকাতাম। তাতে অবশ্য অনেকেই রাগান্বিত হতো। তারপর আর সেখানে বসতাম না। রেললাইনের পথ ধরে হেঁটে যেতাম অনেক দূর। সবকিছুর কোলাহল আর একদম জন-মানবহীন একটি জায়গায় এসে আমি থমকে যাই। এত সৌন্দর্যতায় ভরা স্থান আমি আগে কখনও দেখেছি বলে মনে হয় না।
তবে অবাক হয়েছি এত সুন্দর জায়গা এত জন-মানবহীন আর নীরব কেন। প্রথম যেদিন এই জায়গায় এসেছিলাম সেদিন আমার বয়সি একটা ছেলেকে দেখেছি মনমরা হয়ে বসে থাকতে। দেখতে হালকা ফর্সা, মুখে পাতলা দাঁড়ি। কাঁধের ব্যাগটা দেখে বুঝতে পারলাম সেও একজন ছাত্র হবে হয়তো। ছেলেটা এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে গাছপালার দিকে৷ কারও উপস্থিতি অনুভব করায় আমার দিকে একবার ফিরে তাকালো। তারপর আবার ফিরে গেল সৌন্দর্য উপভোগে।
আমি যে সেখানে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছি সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামতে আরম্ভ করলো। পাখিরা নীড়ে ফেরার জন্য ব্যস্ত। সূর্যদেব দূর গগনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যে অন্ধকার নেমে আসলো। ছেলেটা আমাকে পাশ কাটিয়ে ধীর পায়ে চলে গেল। দেখতে দেখতে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল সে। ততক্ষণে অন্ধকার বেশ গাঢ় বর্ণ ধারণ করেছে। হাঁটতে লাগলাম নির্দিষ্ট্য গন্তব্যের উদ্দেশে। তারপর থেকে প্রায় প্রতিদিন বিকেলে যাওয়া হতো সেই জায়গায়। ছেলেটাকেও একইভাবে বসে থাকতে দেখতাম ঠিক সেখানটায়। তার মুখের দিকে তাকালে মনে হতো বেশ কষ্টে আছে সে। মুখ খানিকটা শুকনো আর মায়ায় ভরা। আমি তার মায়াময় চেহারার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। এটা কোনো বিপরীত লিঙ্গের প্রেম না, এটা মনুষ্যত্বের প্রেম। সে আমাকে দেখেও না দেখার ভান করে উদাস দৃষ্টিতে একদিকে তাকিয়ে থাকতো। আমি নিজে থেকেই তার কাছে গেলাম কথা বলার জন্য। কোনো ইতস্তত না করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম,
“তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি আমার সমবয়সী, তাই তুমি বলেই সম্বোধন করতে চাচ্ছি।”
ছোট্ট স্বরে জবাব দিলো, “জ্বি।”
“তোমার নামটা কি জানতে পারি।”
এইবার সে আমার দিকে কিঞ্চিৎ ঘুরে তাকালো, কিন্তু কোনো কথা বললো না।
আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার নামটা কী?”
এইবারও সে কোনো উত্তর দিলো না। মনে হয় বিরক্তবোধ করছে। আমারও একটু-আধটু রাগ উঠলো। এতটা জলজ্যান্ত মানুষ কথা বলছে আর সেদিকে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ-ই নেই। ভাবলাম হয়তো সে শুনতে পায়নি, তাই আবার জিজ্ঞেস করলাম।
“কথা বলো না কেন, আর তোমার নাম কী?”
এইবার সে আমার দিকে ঘুরে তাকালো আর বেশ ক্ষীণ স্বরে কথা বললো।
“জ্বি, ইমরান।”
“আচ্ছা, কিছু মনে করো না আর ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই, আমি সাধারণ একজন মানুষ।”
আমার কথায় সে বেশ উচ্চস্বরে হেসে উঠলো।
“হাহাহা, ভয় পাবো কেন, ভয় নামক বস্তু আমার জীবন থেকে সেই কবেই মরে গেছে।”
অবাক হয়ে গেলাম আমি। এই ছেলেটাকে কিছুক্ষণ আগেই দেখলাম বেশ চুপচাপ, আর এখন এইভাবে হেসে উঠলো কেন। নিজেই নিজের মনকে প্রশ্ন করতে লাগলাম।
তাকে আবার জিজ্ঞেস করলাম, “তোমাকে প্রতিদিন দেখি এখানে বেশ উদাস মনে বসে থাকো, তোমার বাসা কি এখানেই?”
“না, বালাসিঘাট।”
“আচ্ছা, আমার পিসির বাড়িও সেখানে।”
“ভালো।”
“তুমি কি এখানেই পড়ালেখা করো?”
“হ্যাঁ, এখানেই।”
“কোন স্কুলে পড়ালেখা করো।”
“সদর উপজেলা মডেল কলেজ।”
“তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে পারি।”
“জ্বি বলেন৷”
“তোমাকে বেশ মনমরা মরা আর উদাসীন দেখায় কেন?”

আমার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে সেখান থেকে চলে যেতে লাগলো। বুঝতে পারলাম আমার বলা কথাগুলো তাকে ভীষণ বিরক্ত করেছে। শুধু একটা একটা কথা আমার মনে ভীষণভাবে দাগ কেটে যেতে লাগলো, এই ছেলেটার জীবনে নিশ্চয়ই কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে। এইসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ খেয়াল করলাম সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। গাঢ় অন্ধকার চারপাশের সবকিছুকে অদৃশ্য করে দিয়েছে। পকেট থেকে ফোনটা বের করলাম। ফোনের লাইট জ্বালিয়ে লোকালয়ের পথে হাঁটতে লাগলাম। চিরপরিচিত এই জায়গার মায়া ত্যাগ করতে পারিনি। প্রতি বিকেলে সেখানকার সৌন্দর্যটা আমাকে ভীষণভাবে টানতো। মাঝখানে কয়েকদিন ব্যস্ততার কারণে সেখানে যাওয়া হয়ে ওঠেনি। কয়েকদিন পর বিকেলের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে সেখানে গিয়ে বসে রইলাম। ছেলেটা আজকে এখনও আসেনি। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলাম। জানি না কতক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম। হঠাৎ আজানের স্বরে চমকে উঠলাম। চোখে ঘুম চলে এসেছিল। চারপাশে হালকা অন্ধকার নেমেছে। আমার ডানপাশে চার-পাঁচ হাত দূরে কোনো ছায়ামূর্তির উপস্থিতি অনুভব করলাম। চেহারাটা ভালোভাবে আয়ত্ত করতে পালাম না, তবে বুঝতে পারলাম এটা কোনো মানুষের আকৃতি। কোনো এক ভয়ে বুকটা কেঁপে উঠলো। একটু কাছে যেতেই দেখলাম ইমরান ঠিক আগের দিনগুলোর মতোই বসে আছে। তার কাছে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলাম।
“ইমরান।”
কোনো উত্তর আসলো না। পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম।
“এই ইমরান আমার কথা কি শুনতে পাচ্ছ।”
“জ্বি বলেন।”
“তুমি এত মনমরা হয়ে থাকো কেন?”
“হ্যাঁ, এমনিতেই।

“আজকে আমার সব কথার উত্তর দিয়ে তারপর এখান থেকে চলে যেতে পারবে।”
“আমি সব প্রশ্নের উত্তর দিতে রাজি না।”
“ইমরান, আমাকে তোমার খুব ভালো বন্ধু ভাবতে পারো।”
”হ্যাঁ ঠিক আছে।”
“তাহলে বলো কেন এত উদাসীনতা?”

সেদিনও আমার প্রশ্নের উত্তর পাইনি। রহস্য রহস্যই থেকে যায়। কিছু ব্যস্ততার কারণে আবার কয়েকদিন যেতে পারিনি মায়ায় ঘেরা সেই স্থানে। সকল ব্যস্ততা কাটিয়ে একদিন ছুটে গেলাম সেখানে সোনালী বিকেল আর গাছপালার সৌন্দর্যের সাথে ভাব জমাতে। রেললাইনের পথ ধরে কিছুদূর এগোতেই মানুষের কোলাহল আর জটলা দেখতে পেলাম। কোনো এক অজানা ভয় হৃদয় কাঁপিয়ে দিলো। দু-চারজন সাংবাদিককেও দেখলাম। বুঝতে বাকি রইল না এখানে একটা দূর্ঘটনা ঘটেছে। ভিড় ঠেলে সামনে এগিয়ে আবার থমকে দাঁড়ালাম। একটা মানুষের শরীরের বিভিন্ন অংশগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে আছে। মুখটা চিনতে কষ্ট হয়নি, তবে কষ্টটা পেয়েছি আপন হৃদয়ে। এটা ইমরানের মুখ। ট্রেনের নিচে কাটা পড়ে আত্মহত্যা করেছে সে। অজানা বন্ধুত্বের টানে চোখ বেয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। ছেলেটা বেঁচে থাকতে রহস্যময়ে ঘেরা ছিল আর মৃত্যুর কারণটাও রহস্যই রয়ে গেল। তার জীবনের রহস্যটাও জানা হলো না। রহস্যগুলো রহস্যের বেড়াজালে বন্দী রইল। তারপর থেকে আর নিয়মিত যাওয়া হয়নি সৌন্দর্যময়ে ঘেরা সেই জায়গায়। মাঝে-মাঝে যেতাম আর দুফোঁটা চোখের জল ফেলে চলে আসতাম।

—————–
লেখকঃ আকরাম হোসেন ফারাবি,

Be the first to reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *