কাঞ্চনজঙ্ঘার দেশে – পর্ব একঃ প্রস্তুতি পর্ব, পার্মিশননামা ও খরচাপাতি

image_pdf

কাঞ্চনজঙ্ঘাকে খুব কাছ থেকে দেখার শখ ছিল অনেক আগে থেকেই। এক বছরের বেশি সময় ধরে স্বপ্নের জাল বুনছিলাম। সব কিছু বার বার যাচাই বাছাই করে ৩ অক্টোবর, ২০১৯ কেই রওনা দেবার জন্য শুভদিন ধার্য করা হল। কারণ অক্টোবরে নাকি কাঞ্চনজঙ্ঘা আর পান্দিমের খুব ভালো ভিউ পাওয়া যায়।

 

৬ জনের টিম। মিশু, আরাফাত, আসিফ, সাকিব, মুবারক আর আমি (সাদমান)। কুয়েটের ৬ জন আনাড়ি ট্রেকার। চেষ্টা করছিলাম যাতে শুধু ৬ জনই যেতে পারি। সে অনুযায়ী গাইড আর কুক খুজছিলাম বেশ কয়েক মাস ধরে। এতদিন আগে থেকে খোঁজার পরেও মনমতো কোন কিছু পেলাম না। তার উপর সেরকম কোনো ইনফরমেশন ও ছিল না বাংলাদেশীদের জন্য, যেহেতু মাত্রই বাংলাদেশীদের সিক্কিমে যাবার পারমিশন মিলেছে। যদিও এর মধ্যে অনেকেই নর্থ আর ইস্ট সিক্কিম ঘুরতে গেছিল, কিন্তু ওয়েস্ট সিক্কিমের ব্যাপারে পুরোপুরি তথ্য কারো কাছে পাচ্ছিলাম না। তখন একমাত্র ভরসা ছিলেন আসাদ ভাই।

Tতিনিই কিছু কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশন দিয়েছিলেন। যদিও সেগুলো যথেষ্ট হচ্ছিল না।

শেষমেষ এজেন্সি খোঁজা শুরু করলাম উপায় না পেয়ে। কিন্তু তারা যে বাজেট দিচ্ছিল তাতে আমাদের কিডনি বেচতে হত। তাদের মতে তারা সেই বাজেটে বেস্ট সার্ভিস দিয়ে থাকেন। কিন্তু তাদের কে বুঝাবে যে, আমাদের বেস্ট সার্ভিস দরকার ছিল না। আমাদের নিজস্ব টেন্ট, স্লিপিং ব্যাগ, স্লিপিং ম্যাট্রেস সবই ছিল। আমরা শুধু চাচ্ছিলাম একটু আরটু ডিরেকশন আর দুবেলা দুমুঠো খাবার। কিন্তু কোন এজেন্সি তাতে রাজি হয় না। এতে নাকি তাদের সার্ভিস খারাপ হয়ে যাবে।

তখন মাত্র কয়েকদিন বাকি। এদিকে টিম মেম্বাররা সবাই তুমুল এক্সারসাইজ করতে ব্যস্ত। ক্যাম্পাস ৬-৭ বার করে চক্কর। এক চক্করে প্রায় এক কিলোমিটার। এছাড়া কেউ gym করছে, কেউ সাঁতার কাটছে। কেউ বা ফুটবল খেলছে। কিন্তু এদিকে আমি পড়েছি অথৈ সাগরে। এখনো কিছু ঠিক করতে পারলাম না। শুধু নিজেরা যাওয়াও সম্ভব না, আবার যুতসই এজেন্সি ও পাচ্ছি না। অবশেষে ইন্ডিয়ার Bengal in trekking গ্রুপের admin কৌশিক দার থেকে HikersAB এর খোঁজ পাই, যারা আমাদের মত অসহায় পাহাড় পাগলদের জন্য কিছু ছাড় দেয়। আমি যেন ঘোর অমাবস্যায় পূর্ণিমার চাঁদটা হাতে পাই। দর কশাকশি করে যখন শিওর হই যে এর চাইতে কমে বিশ্বাসযোগ্য আর কিছু পাওয়া সম্ভব না, ঠিক তখনি পড়ে মড়ার উপর খাড়ার ঘা।

এতদিন পর্যন্ত জানতাম বাংলাদেশীদের জন্য প্রয়োজন শুধু Inner Line Permit (ILP) (যা পুরোপুরি ফ্রি, শুধু পাসপোর্ট আর ভিসা দেখালেই হয়ে যায়) আর Kanchenjungha National Park ঢোকার জন্য ৫০০-৬০০ রুপির Protected Area Permit (PAP) (যা নাকি পার্কে ঢোকার আগে আর্মি চেকপোস্ট থেকেই নেয়া যায়)। কিন্তু আসলে ব্যাপারটি এত সোজা না।

ILP সিক্কিমের মেলি (Melli) অথবা রাংপো (Rangpo) থেকে নেয়া যায়, যা যেকোনো বিদেশিদের জন্যই একই রকম। ৫-১০ মিনিটের মধ্যেই পাওয়া যায়। পুরোপুরি ফ্রিতে। ভিসা পাসপোর্ট এর ফটোকপি আর এককপি ছবি দিলেই হয়ে যায়।
আর যেটিকে PAP বলে সেটি নিতে হয় গ্যাংটক থেকে। সেটিকে বলে সিক্কিমের অভ্যন্তরীণ ট্রেক্কিং পার্মিট। সাথে আরো একটি পার্মিট লাগে, যার নাম Environmental fee. এটির জন্য আপনাকে ILP ( যা মেল্লি থেকে নিয়েছেন) এর স্লিপ টি পাঠাতে হবে গ্যাংটকে। এটি ভারতীয় ট্রেকারদের জন্য প্রয়োজন হয় না, কিন্তু অন্য যে কোন দেশের নাগরিকদের এটি দিয়ে তবেই ট্রেকিং পার্মিট নিতে হয়। সেখানকার অফিস থেকে এই পার্মিশন নেবার পরে আরো একটি পার্মিট নিতে হয় ইয়ুকসাম থেকে। যাকে বলে Kanchenjunga National park entry fee. এটি মোটামুটি ৭৫০-৮০০ রুপির মত পড়ে। এর জন্য দরকার হবে আপনার আগের দুটি পার্মিট, সাথে আপনার পাসপোর্ট এর মূলকপি, পাসপোর্ট আর ভিসার ফটোকপি আর দু কপি ছবি।
তাহলে কি হলো পার্মিটের ব্যাপারটা?
বাংলাদেশীদের জন্য মোট ৩ টি পার্মিট প্রয়োজন হয়ঃ
1) ILP ( free) from melli/ rangpo
2) PAP + Environmental fee (11000 rs for 5-10 people group) from gangtok
3) Kanchanjangha National park entry fee ( 800 rs) from য়ুক্সম

(আর ফেরার সময় আরেক বার মেলি চেকপোস্টে এন্ট্রি করতে ভুলবেন না কিন্তু)

যাই হোক, একদম শেষ মুহুর্তে জানতে পারায় পার্মিশন নিতে হালকা সমস্যা পোহাতে হয়। তন্ময় দা বল্লেন, ” চাপ নেই, ব্যবস্থা হয়ে যাবে।” এরপর সব কিছু এজেন্সিই ম্যানেজ করে দেয়। এজন্য তন্ময় দা আর hikersAB উপ্রে আমরা অনেক কৃতজ্ঞ। অবশেষে অক্টোবরের ২ তারিখ রাতে শত চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে বিশাল পোটলা-পুটলি নিয়ে খুলনা স্টেশন থেকে চিলাহাটিগামী রাতের সীমান্ত এক্সপ্রেসে চড়ে বসি।

কাঞ্চনজঙ্ঘার দেশে

আজকের পর্বটি মূলত ছিল পার্মিশন নিয়ে। আমার কাছে মনে হয়েছে এটি অনেক বড় একটি ইস্যু। এজন্যই আলাদা একটি পর্ব করা। এর সাথে বোনাস হিসেবে খরচের ব্যাপারটা দিয়ে দিচ্ছি। অনেকেই জানতে চাচ্ছিলেন খরচের বিষয়টি।

খুলনা- ইয়ুকসাম -খুলনা হিসেবে খরচ দেয়া হল। যারা ঢাকা থেকে যাবেন তারা নিজদের মত সাজিয়ে নেবেন।

খুলনা টু চিলাহাটিঃ সীমান্ত এক্সপ্রেস- ৪৬৫ টাকা (নন এসি)
চিলাহাটি টু ভাউলাগঞ্জঃ ভ্যানগাড়ি- ১৫টাকা
ভাউলাগঞ্জ টু পঞ্চগড়ঃ পাগলু ( লোকাল সিএনজির নাম) – ৪০ টাকা
পঞ্চগড় টু বাংলাবান্দাঃ রিজার্ভ পাগলু – ৬ জন ১০০০ টাকা ( লোকাল বাস ও পাওয়া যায়)
**বর্ডারঃ ট্রাভেল ট্যাক্স – ৫০০টাকা আর এপার ওপারে কিছু দান খয়রাত করবেন। ( তারা দেশের জন্য কত কিছু করছে, কিছু না দিলে চলে নাকি)**
বর্ডার টু ফুলবাড়িঃ অটো – ১০ রুপি
ফুলবাড়ি টু শিলিগুড়িঃ জিপ – ৬ জন ৪০০ রুপি নিসিল। আরো কমে পাওয়া সম্ভব।
শিলিগুড়ি টু ইয়ুকসামঃ ৭ সিটার আশার জাইলো ৬০০০ রুপি- রিজার্ভড (খরচা বেশি হলেও বেশ কমফোর্টেবল ছিল।)
এজেন্সীঃ ১২,০০০ রুপি। (এর মধ্যে যে দিন আসবেন সেদিনের থাকা খাওয়া থেকে শুরু করে ট্রেক শেষ করে এসে সে রাতে ডিনার সহ থাকা, সব ইনক্লুডেড)
পার্মিশনঃ জনপ্রতি প্রায় ৩০০০ রুপি (এজেন্সী ম্যানেজ করে দিসিলো)
ইয়ুকসাম টু জোরেথাংঃ শেয়ারড জিপ- জনপ্রতি ৩০০ রুপি (১০ জন বসতে পারবেন)
জোরেথাং টু শিলিগুড়িঃ শেয়ারড জিপ- জনপ্রতি ২০০ রুপি
শিলিগুড়ি টু বর্ডারঃ সিএনজি – ৬ জন ৩৫০ রুপি
**বর্ডার পারাপার**
বর্ডার টু চিলাহাটিঃ পাগলু- ৬ জন ১৫০০ টাকা
চিলাহাটি টু খুলনাঃ সীমান্ত এক্সপ্রেস ৪৬৫ টাকা

টোটালঃ
বাংলাদেশের ভেতরেঃ ১৯০২ টাকা
বর্ডারে খরচঃ যার যার তার তার
ইন্ডিয়ার ভেতরঃ ১৫৬৩৫ রুপি (apprx ১৮,৭৬০ টাকা)

সর্বমোটঃ ২০৬৬৪ টাকা।
(কিছু বাদ যেতে পারে। তাই মানে মানে ২১,০০০-২১,৫০০ টাকা ধরে রাখেন)

★ নিজে পরিবেশ পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখুন ও অন্যকে রাখতে উৎসাহিত করুন★

গোয়েচালা ট্রেক পরিচিতি

পর্ব দুইঃ  কাঞ্চনজঙ্ঘার দেশে – পর্ব দুই

লিখেছেনঃ সাদমান সাকিব

Be the first to reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *