তুমি চলে যাও

image_pdf

সাদিক ভাই? তুমি চলে যাও। তুমি থাকলে আমি ওদের সামনে যাবো না।
মিহিন আবার কথাটা বলল। আমি খানিকটা অপমান বোধ করলাম। খানিকটা নয়। খুব বেশিই বলা চলে। প্রথমবার যখন বলেছে তখন আমি কেবল ওদের বাসায় এসে পৌঁছাই। এর কিছু সময় পরেই ওর নাম্বার থেকে কল আসে৷ আমি খানিকটা অবাক হই। আশ্চর্য! আমি তো ওদের বাসাতেই আছি। আমাকে ফোন দেওয়ার কী আছে? তবুও ফোন ধরলাম। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে মিহিনের ঝাঁঝালো কন্ঠ শোনা গেল।
-ছাদে আসো একটু।
-ছাদে! ছাদে যাবো কেন?
-আসতে বলছি আসো। বেশি কথা বইলো না।
-কি আশ্চর্য!

ছাদে…
ফোন কাটা গেল। বাবারে বাবা। কি মেয়েরে। ধপাস করে ফোন কেটে দিল! বুঝলাম না। বাসা থাকতে ছাদে গিয়ে কথা বলতে হবে কেন? এই মেয়েটা যে কী করে না বুঝি না।
আমি যখন ছাদে গিয়ে পৌঁছালাম তখন দেখলাম মিহিন ছাদের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। ওর চোখে মুখে তীব্র রাগ ভাসছে। ভ্রু জোড়া কুচকে আছে ভীষণ। আমাকে দেখতেই তেড়ে এলো। একেবারে কাছে এসে বলল,
-তুমি এখানে কেন আসছো?
– কেন আসছি মানে? এখানে আসতে কারণ লাগবে নাকি?
-লাগবে। অবশ্যই লাগবে। অন্তত আমি যতদিন এই বাসাতে থাকবো ততদিন লাগবে। অহেতুক তুমি আমাদের বাসায় আসতে পারবা না।
-শোন, এটা আমার আন্টির বাসা। আমার আন্টির বাড়িতে আমি যখন ইচ্ছা তখন আসবো তাতে তোর কী?
-দেখো ফাজলামো কইরো না। এসব আমার একদম পছন্দ না।
-সেটা তোর ব্যাপার। তোর পছন্দ কি অপছন্দ তাতে আমার কিছুই যাবে আসবে না।
-মেজাজ গরম করবা না বলে দিলাম। এমনিতেই তোমার এই মুখ দেখার ইচ্ছে হয় না আমার। তবুও বারবার সামনে এসে দাঁড়াও।
আমি অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম ওর দিকে। এই মেয়ে কী বলছে এসব? এটা কোন মিহিন? একে তো আমি চিনি না।একটু থেমে মিহিন বলল,
-এই তুমি যাও তো! যাও এখান থেকে। আর এক মূহুর্তও থাকবা না এখানে।
-আশ্চর্য তুই এমন বিহেইভ করছিস কেন বল তো?
-কেন করছি জানো না তুমি? জানো না?
আমি কিছু সময় মিহিনের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। সে রুক্ষ মেজাজ নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। আমি বললাম,
-তাই বলে এমন বিহেইভ করবি?
মিহিন কিছু সময় কোনো কথা বলল না। চুপ করে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। ওর মুখটা যেন একটু মোলায়েম হচ্ছিল। তারপর চট করেই সেটা পরিবর্তন হয়ে আবার রুক্ষ হয়ে গেল। আমি ওকে ঠিক বুঝতে পারলাম না। মিহিন বলল,
-করবো। অবশ্যই করব। তুমি চলে যাবে এখান থেকে। এই বাসা থেকে। আর কখনও আসবা না এখানে।
শেষ কথাটা বলার সময় ওর গলাটা ধরে এলো। আমি কেবল তাকিয়ে থাকলাম ওর দিকে। তারপর চলে এলাম ওখান থেকে। আন্টির সাথেও দেখা করলাম না। ওদের বাসার নিচে যখন আসলাম ঠিক তখনই আন্টি ফোন দিলেন। তিনি রেগেমেগে একাকার। আমাকে অবশ্যই আবার যেতে হবে ওদের বাসায়। তা না হলে উনি আমার সাথে চিরতরে কথা বলা বন্ধ করে দিবে। কোনো সম্পর্ক রাখবেন না আর। আমার খারাপ লাগল এবার। এই আন্টিটা আমাকে কতো আদর করে। এখন আমি কিভাবে উনাকে কষ্ট দেই? কিভাবে চলে যাই স্বার্থপরের মতো? তাই সকল লজ্জার মাথা খেয়ে গেলাম মিহিনদের বাসায়। তবে মিহিনকে নিজের চেহারা দেখালাম না। ওর থেকে দূরে থাকলাম। আজ ওকে দেখতে এসেছে। আঙ্কেল বাসায় নেই। উনি একটু ব্যবসায়িক কাজে শহরের বাইরে গেছেন। উনার আসতে রাত হবে। ঠিক এমন মূহুর্তে মেহমান আসবে বলা হয়েছে।ঘরে আর কোনো পুরুষ নেই। তাই আন্টি আমাকেই খবর দিলেন। আমি গেলাম। এবং তারপরেই সব কাহিনী ঘটল।
পাত্রপক্ষ মেয়েকে দেখতে চাইলো। আমি জড়োসড়ো হয়ে মিহিনের রুমে গেলাম। আন্টিকে জানালাম যে উনারা মেয়েকে দেখতে ইচ্ছুক। কথাটা বলে যখন চলে আসবো ঠিক তখনই মিহিন উপরের কথাটা বলল। আমি এবার সত্যিই তীব্রভাবে অপমান বোধ করলাম। ওর ভার্সিটির ক’জন ফ্রেন্ড ছিল। তারা কেমন করে যেন দেখল আমায়। আন্টি বললেন,
-মানে? কী বলছিস মিহিন? ও থাকলে প্রব্লেম কী?
নাহ৷ আমার আসলেই এখানে আর থাকা উচিৎ না৷ আমি আর নিতে পারছি না। আন্টিকেও বললাম না কিছু৷ দ্রুত ওদের বাসা ত্যাগ করলাম। পকেট থেকে মোবাইল বের করে বন্ধ করে দিলাম৷ মানুষ এভাবে কাউকে অপমান করতে পারে এটা আমার জানা ছিল না। জীবনে এই প্রথম কেউ আমাকে এমন বাজে ভাবে অপমান করেছে। আমার সহ্য হচ্ছে না৷ মিহিনের বিরক্তি মাখা মুখটা মনে পড়লেই আমার গা জ্বলে উঠছে। রাগ হচ্ছে খুব। আবার খারাপও লাগছে। কষ্টও হচ্ছে৷ আমাকে এখন কষ্ট মোছন করতে হবে। মিহিনের চিন্তা বাদ দিতে হবে। তার জন্যে এক কাপ চায়ের প্রয়োজন। চা খেলে আমার রাগ কমে। এটা একটা অদ্ভুত ব্যাপার। আমার সাথে সব অদ্ভুত কান্ডই ঘটে থাকে। আমি একটা চায়ের দোকানে ঢুলাম। তিন কাপ চা খেলাম। উঁহু! কোনো ভাবেই রাগ কমছে না। বরং বাড়ছে। মন খারাপ হচ্ছে ভীষণ। ওর কথা বেশি বেশি মনে পড়ছে। ওখান থেকে বেরিয়ে হাঁটতে থাকলাম। পাগলের মতো হাঁটতে থাকলাম। কোথায় যাচ্ছি, কোন দিকে যাচ্ছি খবর নেই। কেবল হেঁটেই যাচ্ছি। অনেকক্ষণ হঠাৎই চোখ গেল বাস্তার ওপাশের পার্কের দিকে। আমি পার্কের গেইটের উপর শ্যাওলায় অর্ধেক গিলে ফেলা নামটা পড়লাম। যথাসম্ভব এটির নাম মনিপুরী পার্ক। শ্যাওলা উপরের ই-কার এবং ঈ-কারকে গিলে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। সেই হিসেবে পার্কটির নাম দাঁড়ায় মানপুরা পার্ক। ভাগ্য ভালো পার্ক-এর রেফ খেয়ে নেয়নি এখনও৷ তা না হলে একদল উৎসাহী টিন এজাররা এটা নিয়ে বেশ মজা করত। আমি পার্কটাতে ঢুকলাম। এদিক ওদিক হাঁটতে থাকলাম। তারপর কড়া রোদ পড়ে এমন একটা বেঞ্চি খুঁজে বসে পড়লাম। এখানে কড়া রোদ পড়ছে। আমি বসে আছি। রোদটা যদি একটু কষ্ট চুষে নিতে পারে সে আশায়। আমার আশায় জল ঢালা হলো৷ কিছুর কিছুই হলো না। রোদ আমার গায়ের কষ্ট না পানি বের করতে সক্ষম হলো। সে পানি নিতে উৎস বোধ করল। আমার রাগ বাড়ল এবার। বেশি রাগ হলো রোদের উপর। রোদটা এত স্বার্থপ্পর কেন? পানির সাথে একটু কষ্ট বুঝি চুষে নিতে পারে না? আমার বিরক্তি লাগল। চোখে মুখে রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে বসে থাকলাম। মিহিনের কথা ভাবলাম কিছুক্ষণ। মেয়েটা আগে এমন ছিল না। খুব মিশুক ছিল। আমাদের মাঝে খুব ভালো একটি সম্পর্ক ছিল। কিন্তু ওই ঘটনার পর ও কেমন জানি হয়ে যায়। আমাকে দেখতেই পারে না। একদম অপছন্দ করে। অবশ্য এখানে আমারও দোষ আছে। আমি একটু বেশিই করে ফেলি সেদিন। এমনটা আমার করা উচিৎ হয়নি।
সেদিনের সেই ছোট্ট কাহিনী আমার জন্যে কাল হয়ে দাঁড়ায়।
তখন আমি কলেজে পড়ি। ইন্টার বোর্ড পরিক্ষা দিব। মিহিন ক্লাস টেন এ পড়ে। তারও বোর্ড পরিক্ষা সামনে। ঠিক এমন মূহুর্তে সে আমায় প্রপোজ করে বসে। তার প্রপোজ করার ধরন খানিকটা উল্টো এবং ভিন্ন। আমি নিজেই ভীষণ অবাক হই। সেদিন বিকেল বেলা, আমি ওদের বাসার ছাদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বিকলেটাকে উপভোগ করছিলাম। ঠিক তখনই ও কোত্থেকে দৌড়ে এসে আমায় পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। খুব শক্ত করে ধরে। বলে,
-সাদিক,আমি তোমাকে অনেক পছন্দ করি, অনেক। বিশ্বাস করো তোমাকে দেখলেই আমার কেমন জানি অনুভূতি হয়। কেমন জানি মন ভালো হয়ে যায়। আমার এত ভালো লাগে যে তোমাকে বলে বুঝাতে পারব না। সাদিক,আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি কি আমাকে ভালোবাসবে?
আমি সম্পূর্ণ হতভম্ব হয়ে যাই। আমার কথা বলার সাহসটুকু হয়না। বুকটা কেঁপে উঠে। বহু কষ্টে ওকে ছাড়িয়ে ওর দিকে ফিরি আমি। বলি,
-মিহিন, কী বলছিস এসব? মাথা ঠিক আছে তোর?
-হু, আমার মাথা ঠিক আছে এবং আমি যা বলছি সত্যি বলছি। আমি সত্যিই তোমাকে ভালোবাসি।
-এই পিচ্চি, ভালোবাসা কী বুঝিস তুই? ভালোবাসা যে কতো বড় দ্বায়িত্ব সেটা তোর জানা আছে?
-আমি এত কিছু জানি না সাদিক। আমি তোমাকে ভালোবাসি। ব্যস। এতটুকুই।
-আর যদি একবার এই কথা বলছিল তো মাইর খাবি বলে দিলাম। আর আমাকে সাদিক বলে ডাকছিস কেন? আমাকে কি তোর ছোট মনে হয়? আমি তোর ছোট? কিংবা তোমার সাথে পড়ি? আমি তোর বড়। বুঝলি? শোনো, এসব কথা আর কখনই বলিস না। আর আমাকে ভাইয়া বলে ডাকিস ঠিক আছে?
মিহিনের মুখ ফ্যাকাসে হলো।মাথা নিচু করে বলল,
-আমি তোমাকে ভাইয়া বলে ডাকব না।
-কেন? কেন ডাকবি না?
-কারন আমি তোমাকে ভালোবাসি। ভালোবাসার মানুষকে ভাইয়া বলা যায় না।
-চুপ! একদম চুপ। তোকে না নিষেধ করেছি এসব না বলতে।
-আমি বলব। চিৎকার করে বলল। তাতে তোমার কী হু?
-আমার কী মানে? আমার অনেক কিছু। তোকে বলেছি না বলতে, তুই বলবি না। ব্যস।
-বলব,হাজার বার বলব। এটা বলতে আমার ভালো লাগে।
এই বলে ও হাসল খানিকটা। তারপর আমার থেকে খানিকটা দূরে গিয়ে চিৎকার করে বলল,
-সাদিক,আমি তোমাকে ভালোবাসি,ভীষণ…
আমার মাথা কাজ করছিল না সেদিন। তাই রাগের মাথায় ওকে চড় মেরে দেই। ওর চিৎকার দিয়ে বলা কথাটি ও সম্পূর্ণ করতে পারেনি। আমি সেটা হতে দেইনি। আমি চাইলেই ওর প্রেম নিবেদন গ্রহণ করতে পারতাম। কিন্তু আমি করিনি। কারণ আমি চাইছিলাম ও ভালো করে পড়ে ভালো রেজাল্ট করুক। এখন এসবে ধ্যান না দিক। কিন্তু সেটা মিহিন বুঝল না। ও আমার উপর রাগ করে থাকল। আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিল। তখন থেকে ও আমাকে দেখতে পারে না। আমাকে পছন্দ করে না৷ কথাও বলে না। তারপর একদিন আমি সরি ফিল করি। আমার মনে হলো ওকে সরি বলা উচিৎ। আমি আসলেই কাজটা ঠিক করিনি। আমার ওকে বোঝানো উচিৎ ছিল। এভাবে চড় দেওয়া ঠিক হয়নি। আমি ওর কাছে ক্ষমা চাইতে গিয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার হলো ও আমাকে সেদিন অপমান করে তাড়িয়ে দেয়। তারপর থেকে ওর সাথে আমার মনমালিন্য এবং আজ সেটা বৃহৎ রূপ ধারণ করে একটি বিচ্ছেদ ঘটল। এই বিচ্ছেদে আমার রাগ হচ্ছে একদিকে আরেকদিকে খারাপ লাগছে। কষ্ট হচ্ছে। আসলে ওকে আমার প্রথম থেকেই একটু একটু পছন্দ ছিল এবং সেটা ততদিনে বৃহৎ হয়। কিন্তু তার আগেই মিহিন আমাকে অপছন্দ করা শুরু করে। আমি আর সামনে আগাতে পারিনি। আমি ভাবলাম মিহিন একদিন ঠিক বুঝবে। সব মেনে নিবে। আমার ভাবনাটা ভাবনাই থেকে গেল। এটি বাস্তব হলোও না এবং হওয়ার সম্ভাবনাও বাকি থাকল না। আমি অনেক্ষণ পার্কে বসে থাকলাম। সন্ধ্যার দিকে বাসায় ফিরে আসি। কলিংবেল বাজাই। নিলু দরজা খুলে দেয়। নিলু আমার ছোট বোন। ও দরজা খুলে কিছু সময় আমার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তারপর নিজের রুমে চলে যায়। আমি কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না। ও এমন করে তাকাল কেন? যেন আমি মহা কোনো অন্যায় করে ফেলেছি। আমি ভাবতে থাকলাম আসলে আমি কী অন্যায় করেছি। কিন্তু তেমন কিছুই পেলাম না৷ তাহলে ও এভাবে তাকালো কেন? আমি আর ভাবতে পারছিলাম না।মাথাটা হ্যাং হয়ে আসছে। বাসার ভেতর ঢুকে পড়লাম। ঢুকতেই মনে হলো কিছু একটা ঠিক নেই। আসলেই কিছু একটা হয়েছে। তা না হলে বাসা এত থমথমে মনে হতো না। কেমন জানি নিরাবতায় ছেয়ে আছে। আশ্চর্য! সব এত নিরব কেন? বসার ঘরে দেখলাম বাবা চুপচাপ বসে আছে। সাথে মাও মুখ মলিন করে বসে আছে। আমাকে দেখতেই দুজনে তাকালেন। আমি রুমে চলে যাওয়ার জন্যে পাঁ বাড়ালাম। ঠিক তখনই বাবা ডাক দিলেন৷
-এদিকে আয়।
আমি বাবার সামনে গেলাম। বাবা বললেন,
-এতক্ষন কই ছিলি?
-বাইরে ছিলাম।
-সারাদিন বাইরে বাইরে থাকলে হবে? বাসার কোনো খোঁজ খবর কিছু রাখিস?
বাবা একটু জোর করে কথাটা বললেন। আমি কিছু বললাম না। চুপ করে থাকলাম। এবার মা মুখ খুললেন,
-মিহিনের সাথে তোর কিছু হয়েছে?
আমি এবারেও চুপ করে থাকলাম। মাথা নিচু করে রাখলাম। মা আবার বললেন,
-ও নাকি আজ সারাদিন কান্নাকাটি করেছে। কিচ্ছু খাচ্ছেও না। গোঁ ধরে বসে আছে। তোদের মাঝে কী কিছু হয়েছে?
আমি মাথা নিচু করেই থাকলাম। ভাবলাম এটা আবার কোন ন্যাকামি। আমাকে তো অপমান করতে কম করেনি৷ এখন আবার কাঁদছে কেন? বাবা এবার ধমকে বললেন,
-কী হলো, জবাব দিচ্ছিস না কেন?
আমি এবারেও প্রশ্নটার জবাব দিলাম না। বাবা এবার রেগে গিয়ে বলেই ফেললেন,
-আমি বুঝলাম না,তোমার এই গর্দভ ছেলেকে মিহিনের মতো মেয়ে কিভাবে পছন্দ করতে পারে। কি দেখে পছন্দ করেছে ও?
আমি চট করে বাবার দিকে তাকালাম। বাবা তখনও মুখে বিরক্তি মেখে বসে আছেন। অনেকটা সময় খানিকটা নিরাবতায় কাটল৷ এবার মা বললেন,
-মিহিনকে ওরা পছন্দ করেছে। কাল পরশুর দিকে ছেলে নিজে দেখতে আসবে। এটা জানিস তুই?
আমার বুকের ভেতর খানিকটা মোচড় দিয়ে উঠল। কোনো মতে বললাম,
-নাহ। জানি না।
-কেন? তুই ওখানে ছিলি না?
-না৷
-কেন ছিলি না? ইরিনা তোকে এতো আদর করে, এতো স্নেহ করে অথচ আজ তুই ওর এই উপকারটা করলি না?
ইরিনা আমার ওই আন্টির নাম৷ আন্টি তো আমাকে আদর করে। কিন্তু উনার মেয়ে তো আমাকে পছন্দ করে না৷ এটা এখন বাবা মাকে বলি কীভাবে? আমি বললাম,
-আমি ওখানে গিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছিলাম না।
-কেন?
আমি একটু সময় চুপ থেকে বললাম,
-মিহিন চাচ্ছিল না আমি ওখানে থাকি। তাই চলে আসি।
-মিহিন কেন চাচ্ছিল না?
আমি এবার বিরক্তি নিয়ে মায়ের দিকে তাকালাম।
-কী ব্যাপার মা? তুমি কী আমাকে জেরা করছো? আমার তো মনে হচ্ছে আমি নিজের বাসায় না, থানায় এসেছি।
-তুই এটাকে থানা বা বাসা যা-ই ভাবিস সেটা তোর ব্যাপার কিন্তু তোকে আজ প্রশ্ন গুলোর উত্তর দিতেই হবে।
-আমি দিতে বাধ্য নই।
-অবশ্যই বাধ্য। তোকে আজ বলতেই হবে।
-আমি বলব না।
-তাহলে এক্ষুনি বাসা থেকে বের হয়ে যা৷ আমি যেন তোকে এই দু’চোখে আর না দেখি।
বাবা অনেকটা রেগে গিয়ে কথাটা বললেন। আমি আর থাকলাম না। উঠে চলে আসলাম। মা পেছন থেকে বললেন,
-এই কই যাচ্ছিস?
আমি একটু চোখ রাঙিয়ে মায়ের দিকে তাকালাম। তারপর চলে এলাম। বের হওয়ার সময় মা উঠে আসতে চাইলেন। কিন্তু বাবা তখন মাকে থামিয়ে বললেন,
-আরে কই যাবে আর। ক্ষিধে পেলে সুরসুর করে বাসায় চলে আসবে।
মা বললেন,
-তুমি তোমার ছেলেকে আজ পর্যন্ত চিনলে না। জানো না ও এক রোখা টাইপের। তোমাকে কে বলল এমন করতে? আমি কথা বলছিলাম না ওর সাথে? এখন…
আমার কানে আর কিছুই এলো না। আমি সিড়ি বেয়ে নেমে গেলাম। তারপর ফুটপাত ধরে হাঁটতে থাকলাম। আজকের দিনটাই আমার খারাপ যাচ্ছে। সব ওই মিহিনের দোষ। নিজেকে কী ভাবে ও। সাহ! ওর জন্যে আজ আমার বাসা ছাড়তে হলো৷ আচ্ছা এখন কয়টা বাজে? সময় দেখা দরকার। আমি মোবাইলটা বের করলাম৷ এতক্ষণ বন্ধ ছিল। সুইচ অন করতেই দেখলাম অনেক গুলো কল এসেছে। আমি সেদিকে ধ্যান দিলাম না। সময়টা দেখে নিলাম। তুষারকে একটা ফোন করা উচিৎ। আজ রাত ওর সাথেই থাকতে হবে। আমি তুষারকে ফোন দিলাম। কয়েকবার বাজতেই ফোন তুলল ও।
-দোস্ত,কই তুই?
-কই আবার। বাসায়। তুই কই?
-আমি আছি আশেপাশেই। আচ্ছা শোন,তোর সাথে কী আজ থাকা যাবে?
-থাকা যাবে মানে? চলে আয় ব্যাটা। আড্ডা দেওয়া যাবে অনেক্ষণ। তোর সাথে কতো দিন আড্ডা দেওয়া হয় না।
-হ্যাঁ রে। ঠিক বলেছিস।
-তা চট্রগ্রাম থেকে কখন এলি।
-আসছি কাল রাতে।
-রাতে এলি আর সেটা এখন বলছিস আমায়?
-সরি রে। একটু ব্যস্ত ছিলাম। দেখা হলে সব বলব৷
-আচ্ছা। তা এখন কোথায় তুই?
-এই হাঁটছি। ভাবছি হাতিরঝিল যাবো। ভালো লাগছে না রে।
-আচ্ছা যা। সময় করে চলে আসিস।
-আচ্ছা।
আমি ফোন রেখে দিলাম। তুষার আমার ছোট বেলার বন্ধু৷ খুব কাছের বন্ধ বলা চলে। ইন্টার পর্যন্ত আমরা এক সাথে ছিলাম। এরপর আমাদের একটা বিচ্ছেদ ঘটে। ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পায় আর আমি চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর থেকে আমাদের যোগাযোগ একটু কমই হয়। আবার খুব কম হয় না৷ মোটামুটি ভালোই বলা চলে।
আমি হাতিরঝিল চলে এলাম। হলদে বাতির নিচে হাঁটতে থাকলাম। ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকলাম কিছুক্ষণ। এখানকার পরিবেশটা খুব সুন্দর। আমার কাছে বেশ ভালো লাগে। এমন আরো কয়েকটা জায়গা আছে। আমার মন খারাপ থাকলেই আমি ওইসব জায়গা গুলোতে চলে যাই। আমার মন ভালো হয় দ্রুত। পরিবেশটা মনে হয় মন ভালো করার জন্যে সার্বক্ষনিক তৈরি থাকে৷ কিন্তু আজ আমার মন ভালো হচ্ছে না। এই প্রকৃতিটা কোনো ভাবেই আমার মন ভালো করতে পারছে না৷ বরং মনটা আরো খারাপ হচ্ছে যেন। আমি আরো কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকলাম এখানে৷ হঠাৎই দেখলাম অল্প দূরে একটা কার এসে থাকল। কারটাকে বেশ চেনা চেনা মনে হলো আমার। আমি সেদিকে ধ্যান দিলাম না। চোখ ফিরিয়ে নিলাম। আবার কী মনে হতেই আমি কারটার দিকে তাকালাম। তারপর যা দেখলাম সেটা দেখার জন্যে আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না৷ আমি কেবল অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকলাম। তারপর দ্রুত চোখ ফিরিয়ে নিলাম। মনের ভেতর কেমন জানি করছে৷ অদ্ভুত একটা শিরশিরে অনুভুতি হচ্ছে। বুকের ভেতর কাঁপছে যেন। ভাবনা গুলো জড় হচ্ছে দ্রুত। ও এখানে কীভাবে এলো? ও কীভাবে জানে যে আমি এখানে? কে বলেছে? তুষার? ওহ্ শিট! আমি নিজেই তো তুষারকে বলেছি যে আমি এখানে আছি। ওই-ই বলেছে হয়ত। মিহিন একদম আমার কাছে চলে এলো৷ আমার দিকে তাকিয়ে থাকল এক দৃষ্টিতে। আমি ওর দিকে ফিরলাম না। চুপচাপ সামনের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। মিহিন অভিমানী স্বরে বলল,
-সবার রাগের প্রাধান্য আছে। কেবল আমার রাগে নেই। কেউ আমার রাগের মূল্য দেয় না৷
আমি একটা কথাও বললাম না। দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। মিহিন আবার বলল,
-সাদিক!
আমি চট করেই ওর দিকে ফিরলাম। বললাম,
-এই আমাকে সাদিক বলে ডাকবি না। ভাই বলে ডাকবি। আমি…
ও হুট করে আমার কলার চেপে ধরল৷ নিজের মুখটা আমার মুখের খুব সামনে নিয়ে এনে বলল,
-খবরদার,আর একবার যদি এই কথা বলেছো তবে তোমার খবর করে ছাড়বো। তুমি আমার কোন জন্মের ভাই হুম।
-তো ঠিকই তো৷ আমি তো তোমার…
আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। কেবল অবাক হলাম। সাথে শীতল কিছু একটা অনুভব করলাম।সমস্ত গায়ে একটা শীতল শিহরণ বয়ে গেল। মিহিন দু ঠোট সরিয়ে নেওয়ার আগ পর্যন্ত আমি কেবল স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থকলাম৷ সেই শীতল অনুভূতি যেন আমার শরিরে এখনও রয়ে গেছে৷ আমি কেবল অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখলাম মিহিনকে। মিহিন মৃদু হাসল। বলল,
-এ কথা আর বলো না। আর কখনই বলো না ঠিক আছে?
আমি ওর দিকে থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম। সামনের দিকে তাকালাম। বললাম,
-তুই এটা কী করলি? আমাকে কিস করলি কেন?
-আমার ইচ্ছে। আমার বরকে আমি কিস করবো তাতে তোমার কী?
-তোর বর কে?
-সাদিক
-আবার?
-এই সাদিক, আমরা হানিমুন কোথায় করবো বল তো?
আমি কিছু বললাম না। চুপ করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলাম। মিহিন আমার হাত ধরল। বলল,
-এখনও রাগ করে আছো?
আমি অন্যদিকে ফিরলাম। মিহিন আবার বলল,
-আসলে তোমাকে আমাদের বাসায় দেখলেই আমার খারাপ লাগত৷ বারবার ইচ্ছে হতো তোমার কাছে ছুটে যাই৷ কথা বলি৷ কিন্তু সেই পথ বন্ধ ছিল৷ আমি তোমাকে পেয়েও পেতাম না৷ এই কষ্ট আমাকে ভীষণ ভোগাতো৷ আমি সহ্য করতে পারতাম না। তাই তোমার সাথে অনিচ্ছায় এমন বিহেইভ করি৷ আমি জানি তোমার কষ্ট হয়৷ কিন্তু বিশ্বাস করো এরচে কয়েক গুন বেশি কষ্ট আমার হয়৷ আমার ঘুম হয় না৷ যেদিন তোমার সাথে বাজে বিহেইভ করি সেদিন আমি ঘুমাতে পারি না৷ খেতে পারি না৷ সারাদিন কান্না করি। আমি সত্যিই খুব কষ্ট পেতাম৷
আমি মিহিনের দিকে তাকাই৷ দেখি মেয়েটা ভেজা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার খারাপ লাগে। এই মেয়েটার চোখের জল আমার সহ্য হয় না৷ আমার রাগ পড়ে যায়৷ অভিমান ভাঙ্গে। মেয়েদের এই এক অসাধারণ ক্ষমতা। ছেলেদের যেকোনো ভাবে মানিয়ে নিতে পারে ওরা। একটু দ্রুতই পারে। আমি বলি,
-আসলে ওই দিন আমিও বেশি বেশি করে ফেলি।আসলে…
-থাকনা ওসব। আমি ওসব শুনতে চাই না৷ আমি নতুন করে শুরু করতে চাই৷ তোমাকে সাথে নিয়ে থাকতে চাই৷ সাদিক, তুমি কি এবার আমার হবে। নিজেকে আমার কাছে দিয়ে দিবে? তোমাকে খুব প্রয়োজন আমার। কেবল বেঁচে থাকার জন্যে হলেও প্রয়োজন৷ প্লীজ সাদিক।
আমি অনেকটা সময় মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থাকলাম৷ তারপর বললাম,
-তোমার না বিয়ে ঠিক হয়েছে?
-ঠিক হয়েছে। বিয়ে তো হয়ে যায়নি।
-তা অবশ্য ঠিক।
-কী ঠিক? আমি কী বলেছি তোমাকে? আমার কথার উত্তর দাও আগে।
আমি হাসলাম খানিকটা। বললাম,
-তোমাকে তো আমি সেই ছোট বেলা থেকে পছন্দ করি। ভালোবাসি৷ তুমি কি এটা আগে বুঝতে পারোনি?
মিহিন হাসল কেবল৷ তারপর আমাকে জড়িয়ে ধরল। ভেজা স্বরে বলল,
-সাদিক,আমি সেই কখন থেকে কিচ্ছু খাইনি৷ আমার খুব খিদে পেয়েছে।
কথাটা এতো মায়া নিয়ে বলল যে আমার ভালো না লেগে পারা গেল না। আমি হাসলাম। বললাম,
-আমিও খাই নাই। চল দুজনে একসাথে ডিনার করি। চলো।
মিহিন আমার হাত ধরল। আমরা দুজনে একসাথে হাঁটতে থাকলাম। বাকি জীবনও এভাবে থাকব আমরা দুজন। যেকোনো ঝড়ই আসুক না কেন আমরা আলাদা হবো না। মোটেও না।

Be the first to reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *