দীপান্বীতা

image_pdf

গোলগাল মুখ, নাদুস নুদুস গাল আর লম্বা নাকের মেয়েটাকে প্রথম দেখাতেই মনের ভিতরে এক অজানা শিহরণ বয়ে গিয়েছিল সেদিন৷ এ এক অন্যরকম অনূভূতি ছিল৷ যে অনূভূতির সাথে কখনো পরিচয় ঘটেনি আমার৷ অনূভূতিটার নাম যদি প্রেম হয়৷ হ্যা তাহলে আমি প্রেমেই ডুব দিয়েছিলাম সেদিন৷ দিনটি ভার্সিটির প্রথম দিন ছিল৷ মেয়েটাকে দূর থেকেই দেখেছিলাম৷ কাছে যাওয়ার সাহস হয় নি তখনো৷ সম্ভবত মেয়েটা ও আমার মত নতুন৷ এদিকে ওদিক ঘুরাঘুরি করছিল৷


-বন্ধুমহলে সবসময় প্রেম বিরোধী ভাষণ দেওয়া ছেলেটাও আজ প্রেমে পরেছে৷ খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছিলাম মেয়েটার নাম দীপান্বীতা৷ উফফ! অস্থির একটা নাম৷ আমাদের ভিন্ন ডিপার্টমেন্ট ছিল৷ সচরাসচর দেখা না হওয়ারই কথা৷ কিন্তু আমি যে প্রেমে পরেছি৷ না দেখে থাকা যায় নাকি?

-তখন ও দীপান্বীতার সাথে কথা হয় নি৷ ভয় লাগতো৷ কি না কি হয়ে যায়! কিন্তু ভয় পেলে তো চলবেনা৷ প্রেমিক পুরুষদের ভয় পেতে নেই৷ একদিন সাহস করে পিছন থেকে ডাক দিয়েই দিলাম৷ মনে আছে, ডাক দেয়ার পর ৫সেকেন্ড এর মত আমার হাটুঁ কেপেঁছিল সম্ভবত৷ হয়তো ১০সেকেন্ড পর দীপান্বীতা পিছন ফিরে তাকিঁয়েছিল৷ আহ! কি শান্ত চাহনী৷

-নাম জিজ্ঞেস করেছিলাম প্রথমেই৷ উত্তরের অপেক্ষায় ছিলাম৷ দীপান্বীতা মুচকি হেঁসে বলেছিলো, এতদিন পিছে পিছে ঘুরছেন আর নামটা জানতে পারলেন না? আমিতো মেয়ের কথা শুনে আবুল হয়ে গেলাম! সে হয়তো আমার বিব্রতকর অবস্থা আচঁ করতে পেরেছিল৷ বলেছিল, চলুন হাটাঁ যাক৷ হাঁটতে হাটঁতেই নাহয় পরিচিত হবো৷

-দীপান্বীতা যে এত সহজেই মিশে যাবে ভাবতেই পারিনি৷ সেদিন অনেক কথাই হয়েছিল দুজনার৷ আমার চেয়ে দীপান্বীতাই বোধ হয় বেশী কথা বলেছিল৷ আমিও অনেক কিছু বলেছি৷ কিন্তু আসল কথাটাই বলতে পারিনি৷ আর এত তারাতারি বলাটাই যেন কেমন দেখায়? নাহ, এত তারাতারি বলা ঠিক হবে না৷ তখন আবার আমার কারনে পুরো পুরুষজাতিই লজ্জা পাবে হি হি৷

-এরপর থেকেই আমরা খুব মিশতাম৷ সবকিছু একে অপরের সাথে শেয়ার করতাম৷ অথচ তখন ও আমরা জানি না, আমরা একে অপরের কী? বন্ধু বা ভালবাসি! কোনোটাই বলা হয় নি৷ বলতে চেয়েছিলান অনেকবার৷ কিন্তু বলি নি, দরকার মনে করিনি হয়তো৷ যেরকম ছিলাম খারাপ ছিলাম না৷

-একদিন সাহস করে বলেই ফেলেছিলাম! দীপা ভালোবাসি তোমাকে! জবাবে সে মুচকি হেঁসেছিলো৷ নীরবতাই সম্মতির লক্ষণ ধরে নিয়েছিলাম৷

-এরপর থেকে দীপার পাগলামীটা একটু বেড়েই গিয়েছিলো৷ অদ্ভূত অদ্ভূত সব আবদার ছিলো ওর৷ বৃষ্টিতে ভিজে আইসক্রিম খাওয়া৷ প্রচন্ড রকমের ঝাল দিয়ে ফুচকা খাওয়া৷ আমি তেমন একটা ঝাল খেতে পারতাম না৷ কিন্তু দীপার কারণে খেতে হতো৷ কিন্তু আমি ছিলাম বেসম্ভব রকমের পেটরোগা৷ যেদিন ফুসকা খেতাম, এর পরের দিন আর বাসা থেকে বের হতে পারতাম না৷

-দীপার কথা মা কে বলেছিলাম৷ একদিন সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম আমাদের বাসায়৷ মা অনেক খুশি হয়েছিল৷ প্রথমে বিশ্বাসই করে নি, তার হাবাগোবা ছেলেটির ও মেয়ে বন্ধু থাকতে পারে! সেদিন মা আর দীপা অনেকক্ষণ আড্ডা দিয়েছিল৷ দীপা যাওয়ার পর মা আমাকে উনার রুমে ডেকে নিয়েছিলেন৷ আর বলেছিলো, মেয়েটা খুব লক্ষী রে৷

-দিনগুলো অসাধারন কাটছিলো৷ আমার জীবনে সুন্দর মূহূর্তগুলোর প্রায় সবই দীপার সাথে কেটেছিল৷
হঠাৎ একদিন ফোন করে দেখা করতে বলল ৷ ওর গলা শুনেই খটকা লেগেছিল কিছু একটা হয়েছে৷ কিন্তু ওর সাথে দেখা হওয়ার পর , ওর মুখ থেকে যা শুনেছি! তা হয়তো আমার না৷ কারো সহ্য হবে না৷

সেদিন মেয়েটা মুখ গম্ভীর করে বলেছিল,
-শুভ্র ভুলে যাও আমাকে৷ (দীপা)
-ভুলে যাওয়ার জন্যতো ভালোবাসিনি তোমাকে৷ (শুভ্র)
-তোমাকে ভালোবাসি! এ কথাটা কখন ও বলেছি তোমাকে? (দীপা)
-নীরবতাই সম্মতির লক্ষণ, ধরে নিয়েছিলাম৷ (শুভ্র)
-ভুল ভেবেছো৷ (দীপা)
-চলে যাচ্ছো যাও৷ কিন্তু যাওয়ার কারণ টা বলো৷ (শুভ্র)
-কিছু জিনিসের কারণ থাকে না৷ (দীপা)
আর একমূহূর্ত ও দাড়াঁইনি মেয়েটা৷ আমি আশায় ছিলাম অন্তত একবার হলেও ফিরে থাকাবে৷ কিন্তু আশাটা আশাই রয়ে গেলো৷

-এরপর থেকে কেমন জানি হয়ে গিয়েছিলাম৷ সেটা আমি নিজেই জানি না৷ জীবনের কঠিন দিনগুলো অতিবাহিত হতে লাগলো৷ মা হয়তো ব্যাপারটা আচঁ করতে পেরেছিল৷ প্রায়ই আমার রুমে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতো৷ তারপর ও দীপাকে ভুলা অসম্ভব হয়ে পড়েছিলো৷ জীবনের প্রতি হতাশ হয়ে পড়েছিলাম৷ সুসাইড করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি৷

-যেদিন রাতে সুইসাইড করবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম৷ সেদিন মা কে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলাম অনেকক্ষণ৷ কিন্তু মা একবার ও জিজ্ঞেস করেনি! শুধু পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়েছিল৷

-ছাদে গিয়েছি৷ শেষবারের মত আকাশটা দেখতে চাই৷ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি৷ পিছন থেকে ঘাড়েঁ কারো হাত ছোয়াঁ লেগেছে৷ বুঝতে পেরেছি, হাত টা মায়ের হাত৷ আমার জীবনে একমাত্র ভরসা এই হাত৷

-খোকা! এই সময়ে ছাদে তুই? (মা)
-আকাশ দেখছি মা৷ (আমি)
-আয় খোকা, আমার কোলে মাথা রেখে তারপর আকাশ দেখবি৷

দোলনায় মা বসে আছে আর আমি মায়ের কোলে মাথা রেখে সেই ছোট্ট খোকাটা হয়ে আকাশ দেখছি৷ মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে৷ জীবনটা আবার খুব সুন্দর মনে হচ্ছে৷ আবার বাচঁবো আমি৷ মায়ের জন্য বাচঁবো৷ বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত যে মা আমাকে দুঃখের ছোঁয়া পেতে দেয়নি৷ সেই মা কে আমি ছেড়ে যাব! তা ও একজন মেয়ের জন্য!

-সেদিন মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, খোকা !জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না৷ তুই আবার নতুন করে শুরু কর৷ একদিন দেখবি, তোর আজকের দিনের পাগলামোর কথা মনে পড়লে তোর নিজেরই হাসিঁ পাবে৷

হ্যা আমি পেরেছি৷ সেদিনের পর থেকে অন্যরকম ভাবে জীবনটা সাজিয়েছিলাম৷ দীপা কে ভুলতে কষ্ট হয়েছে অনেক৷ ভুলতে পেরেছি বটে৷ তবে মাঝে মাঝে মিস করতাম খুব৷ কিন্তু দিন যেতে লাগলো৷ এখন মনে পড়লেও, অনূভূতিগুলো মরে গেছে৷

-মায়ের কথাটাই সত্যি হলো৷ অতীতের পাগলামোগুলো মনে করে হাসিঁ পায় আমার৷ এখন আমার জীবন বলতে , আমার মা আর সামিয়া৷ মায়ের পছন্দ করা মেয়েটাকেই বিয়ে করেছি৷ “ভালোবাসা” জিনিসটাকে নতুন করে শিখিয়েছে মেয়েটা৷ খুব ভালোবাসে আমাকে আর মা কে৷ আর আমি একটু দোষ করলেই ,গাল ফুলিয়ে বসে থাকবে৷ আর মা কে মিথ্যা নালিশ দিবে৷ আর মা টা ও একদম বৌ এর ভক্ত৷ দুজনে মিলে আমাকে কানে ধরে উঠবস করাবে৷ আর সামিয়া খিলখিল করে হাসঁবে৷ এর চাইতে বেশী কিছু এই ছোট্ট মানবজীবনে পাওয়া আদৌ সম্ভব কিনা জানিনা৷
“সত্যি খুব ভালো আছি”৷

পরিশিষ্টঃযে ভাই/বোন” প্রেমের” মত ঠুনকো জিনিস নিয়ে আত্নহত্যার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন তাদেরকে বলছি৷ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে মা,বাবা, পরিবারের মানুষগুলোর দিকে ফিরে দেখুন৷ এক একটা মানুষ কি পরিমাণ ভালোবাসে আপনাকে! সেই ধারনা আছে কী? আপনি চলে গেলে মানুষগুলোর মনের অবস্থা কি হবে ভেবে দেখুন? হারানোর যন্ত্রণাটা তো আপনি বুঝেন তাই না? ঘুরে দাড়াঁন৷ জীবনটা সহজ নয়৷ দুঃখ ছাড়া জীবন পরিপূর্ণ নয়৷ পরিবারকে সময় দিন, বন্ধুবান্ধবের সাথে আড্ডা দিন৷রোজ সকালে খালি পায়ে হেটেঁ প্রকৃতি উপভোগ করুন৷ তখন বুঝবেন আর মনে মনে বলবেন”জীবনটা আসলেই সুন্দর”৷

Please Rate This Post
[Total: 7 Average: 3.9]

You may also like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *