ধর্মের দেয়াল

ধর্মের দেয়াল পর্বঃ ০১

Posted by

ধর্মের দেয়াল

দিদি তোর দেবরের চরিত্র ভালো না। আজ আমার বুকে হাত দিয়ে বলল, “বেয়াইন সাব আপনার জ্বর এখনো কমেনি?”

দিদি ফিক করে হেসে বললেন, “জাহিদ একটু ওরকমই পূজা। বেশি ফাজলামি করে, তুই মনে কিছু করিস না।”

আমি দিদির দিকে চোখ বড় করে তাকিয়ে বললাম, “এগুলো কোন ধরনের ফাজলামি? গায়ে হাত দিয়ে কথা কেন বলবে?”

দিদি চুপ হয়ে আছে। মিশু কোথা থেকে বল নিয়ে এসে বলল, “মাসি চলো ক্রিকেট খেলি।”

দিদির উপর রাগ দেখাতে না পেরে চট করে এক থাপ্পর আমি মিশুর গালে বসিয়ে দিলাম।

“যাতো মিশু এখান থেকে।” – মিশু কাঁদতে কাঁদতে বাইরে চলে গেলো। দিদি বসা অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়াল।

“তুই আমার ছেলের গায়ে হাত দিলি কেনো পূজা?”

আমিও ছেড়ে দিলাম না।

“চরটা তো তোকে মারা উচিত ছিলো দিদি। তোকে পারিনি তাই মিশুর গালে মারলাম।” -দিদি হাঁ করে তাকিয়ে আছেন।

“তুই আমাকে এমন কথা বলতে পারলি?”

“পারলাম। ভালোবেসে ঘর ছারলি! তাতেও শেষ হয়নি।সনাতন ধর্ম ছেড়ে মুসলমান হয়ে গেছিস। সেই শোকে বাবা মারা গেলেন। শুনছি এখন নাকি গরুর মাংসও খেয়ে বেড়াচ্ছিস। ছিঃ!”

কথাগুলো বলতে গিয়ে চোখ লাল হয়ে গেলো আমার।

দিদি মুখ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বললেন, “ভালোবেসেছিস কখনো কাউকে? বাসলে বুঝতি প্রেম ধর্ম-কর্ম মানে না।”

“আমার বুঝে কাজ নেই। কেমন ছেলেকে ভালোবেসেছিস তাতো তার ভাইয়ের চরিত্র দেখেই বুঝতে পারছি। তোর এখানে বেশিদিন থাকলে তোর সাথে আমিও নরকে যাব।”

দিদি আবার আমার হাত ধরে বসে পরলেন।

“আর ক’টা দিন থাক না পূজা, তোর দুলাভাই বিদেশে চলে যাওয়ার পর থেকে বড্ড একা লাগে আমার।”

রাগ দেখালেও মায়া লাগে দিদির উপর। কী করব? মায়ের পেটের বোন তো। মায়ের কাছ থেকে আসার সময় বলে আসিনি দিদির এখানে আসব। আত্নীয়-স্বজনও জানে আমি দিদির সাথে যোগাযোগ রাখি না। উপড়ের দিকে ‘থু থু’ ছিটালে যে নিজের গায়ে পড়ে।

আমি বললাম, “থাকতে পারি এক শর্তে। তুই আমার আর মায়ের সাথে ইন্ডিয়া চল। গঙ্গা স্নান সেরে পাপ মোচন করে আসবি।”

দিদি আমার হাতটা ছেড়ে দিলেন।

“বাবার মতো প্রত্যেকটা কথায় তুই ধর্ম কেনো টেনে আনিস পূজা? পরশু আসার পর থেকে একবারও আমাকে দেখেছিস নামাজ পরতে বল?”

“ঠাকুর-দেবতার নাম নিতেও তো দেখেনি। সত্যি করে বলতো দিদি, তুই আর দুলাভাই কি নাস্তিক হয়ে গেছিস?”

“না। তোর দুলাভাই ঠিকি মুসলিম আছে। আমি কী হয়ে গেছি নিজেও জানি না। জিহান কখনে ধর্ম নিয়ে জোর করে না তবে আমি মাঝে মাঝে ইশ্বর এর কাছে মাফ চেয়ে নেই।”

“তোর কথার মাথা-মুন্ডু না আমি ঠিক বুঝি না। শোন দিদি, মা আর আমি সামনের মাসে ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছি। কবে নাগাত তোর সাথে আবার দেখা হবে জানি না।”

দিদি মন খারাপ করে বললেন, “মা একবার আসবেন না আমার সাথে দেখা করতে?”

“এত কিছুর পর কেউ কি আর আসে বল? আমি তো পড়েছি দোটানায়! না পারি মাকে ছাড়তে না পারি তোকে।মিথ্যা বলে তোর এখানে এসে দু’দিন ধরে পরে আছি। তার উপর এখন জ্বরে পড়লাম।”

“চলে গেলেই তো গেলি। আজকের দিনটা থাক। তোর পছন্দের সব খাবার রান্না করে খাওয়াই। দিদির সাথে রাগ করে থাকতে নেই।”

আমি আর কথা বাড়ালাম না। দিদি বের হতেই কোথা হতে জাহিদ বজ্জাদ আবার উদয় হলো। আমি মুখ গোমড়া করে খাটে বসে আছি। জাহিদ একটা চেয়ার টেনে আমার কাছে এগিয়ে বসতেই আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।

“দেখুন, আপনি যদি আমাকে আবার বিরক্ত করেন ভালো হবেনা বলে দিচ্ছি। শুধু দিদির কথায় আজকের দিনটা এখানে আছি। আগামীকাল চলে যাব।”

জাহিদ বলল, “আহা! আপনি এভাবে চেঁচাচ্ছেন কেন বেয়াইন সাব? দেখুন, আমি কিন্তু আপনাকে বেশ পছন্দ করি। আপনার লাবণ্য দিদি আর আমার ভাইয়ের সম্পর্কটা ঠিক শারুখ খান আর গৌরির মতো। কোন ঝামেলা নেই।”

“লেকচার দিবেন না। লেকচার আমার পছন্দ না। দিদির মতো নরম মনের মেয়ে আমি নই। রেগে গেলে খুব খারাপ হবে।”

“আপনি কিন্তু শুধু শুধু রেগে যাচ্ছেন। আচ্ছা আপনার জ্বর কমেছে?”

“যদি আবার গায়ে হাত দেন। হাত কেটে দিবো বলে দিচ্ছি।”

জাহিদ হো হো করে হাসছে। আমি ভ্রু কুঁচকে আরেকদিক তাকিয়ে সেই হাসি শুনছি।.

বিকেল থেকে জ্বর ক্রমশ বাড়ছে। দিদি আমাকে জোড় করে দু লোকমা ভাত খাইয়ে দিলেন। ব্যস! ওমনি বমি করে সব ফেলে দিলাম। শরীরটা ক্রমশ দুর্বল হচ্ছে। মায়ের সাথে দুপুরে কথা হয়েছে। আর কথা বলার মতো শক্তি নেই। বেশ কয়েকবার ফোন দেয়ার পর দিদি ফোন ধরতেই মা বুঝতে পেরে ফোন কেটে দেন। দিদি হাউমাউ করে কান্না শুরু করেন। আমি জ্বরের ঘোরেই বলে উঠি, “কাঁদবি না দিদি।একদম কাঁদবি না।তুই এতো বাজে ভাবে কাঁদিস আমার জ্বর তাতে আরো বাড়ে।”

জাহিদ তিন বার আমার কাছে এসে বলল, “বেয়াইনসাব, সামনে রিকশা নিয়ে এসেছি। চলেন ডাক্তার এর কাছে যাই। কথা দিচ্ছি, গায়ে হাত দিবো না। প্রয়োজন হলে রিকশার মাঝখানে কোলবালিশ রেখে দেবো।”

আমি বড় নিশ্বাস ছেড়ে বলি, “চুপ থাকুন তো। কোন দরকার নেই। আমার লাশ শশানে চলে যাক, তবু আপনার সাথে ডাক্তারের কাছে যাব না।”

ধর্মের দেয়াল

দিদি বললেন, “জিদ করিস না পূজা। আমার বড্ড ভয় করছে। জ্বর তো বেড়েই যাচ্ছে তোর।”

আমার নিশ্বাসেই গরম শ্বাস-প্রশ্বাস আমি অনুভব করছি। মনে মনে ভাবছি সৃষ্টিকর্তা এতো ধর্মের মানুষ কেনো সৃষ্টি করলেন। দিদির সাথে যখন-তখন দেখা করতে পারি না। মনটা বড় কাঁদে আমার।

ধর্মের দেয়াল

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি। সাত নম্বর বিপদ সংকেত। চট্টগ্রামের অধিকাংশ রাজপথ বন্ধ। আমার শরীর খারাপের চেয়ে ও খারাপ লাগছে। উঠে দাঁড়াতে পারছি না। দিদি বারান্দায় গিয়ে খানিককাল পরে বৃষ্টির তেজ দেখছে আর বলছেন, “হে ইশ্বর! রক্ষা করো। আমার বোনটা বোধহয় মরে যাচ্ছে।”

আমি শুধু একবার ছোট নিশ্বাস নিয়ে বললাম, “এই মিশু, দিদিকে বলতো লেবু কেটে আনতে আমার আবার বমি আসছে।”

দিদি লেবু এনেছিলো কিনা আমার মনে নেই। তবে জাহিদ যে বাইরে বেবিট্যাক্সি নিয়ে এসেছে তার আওয়াজ আমার কানে এসেছে।

ধর্মের দেয়াল

বেবিট্যাক্সিতে বসে ছিলাম ঝিম মেরে। দু’হাত দিয়ে দিদি আমাকে ধরে রেখেছেন। আরো দুবার বমি করে দিয়েছি জাহিদের গায়ে। খেয়াল করলাম বমি করার সময় জাহিদ বুকের উপর মালিশ করছে। বিদ্যুৎ চমকানোর আলোতে জাহিদের দিকে তাকিয়ে আবার একবার বললাম, “তুই আবার আমার গায়ে হাত দিয়েছিস?”

দিদি তীক্ষ্ণ গলায় বললেন, “ছিঃ পূজা। জাহিদকে ‘তুই-তোকারি’ করছিস কেন?”

জাহিদ বলল, “বাদ দেন ভাবী। জ্বরের ঘোড়ে আছে। আমি কিছু মনে করিনি।”

বেবিট্যাক্সি রাস্তায় জ্যামে পরেছে। আমি দিদির কাঁধে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পরলাম। এই ঘুম আমার ভাঙলো পরেরদিন সকালে। আমার মাথার কাছে মা পুষ্পা দেবী বসে আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। আমার জ্ঞান ফিরেছে দেখেই মুচকি হাসি দিলেন। আশে-পাশে আর কেউ নেই। মা মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “এখন কেমন লাগছে মা আমার?”

ফেসবুকে আমরা

ধর্মের দেয়াল

আমি একবার চারদিকে তাকিয়ে বললাম, “চোখ খুলে মাকে দেখলে পৃথিবীর কোন সন্তানের আর খারাপ লাগে মা? দিদি কোথায়?”

মায়ের মুখটা কালো হয়ে গেলো। তিনি বললেন, “কেনো গিয়েছিলি ওই মুসলমানের বাসায়?”

“দিদি কোথায় বলো মা?”

“আছে হয়তো হাসপাতালের বারান্দায়। তোর বাবাকে শেষ করে সাধ মিটেনি, এখন তোকে শেষ করতে চাইছে।”

মায়ের কথা শেষ না হতেই দিদি কেবিনে ঢুকে পড়লেন।আমার কাছে প্রায় দৌড়ে এসে বললেন, “ইশ্বর আমার প্রার্থনা শুনেছেন। পূজা তোর জ্ঞান ফিরেছে।”

মা বিরক্ত হয়ে বললেন, “একটু সরে দাড়াতো লাবন্য। তুই পাশে থাকলে আমার গা কেমন ঘিন ঘিন করে।”

মায়ের কথা শুনে দিদি কেঁদে ফেললাম। আমি বললাম, “এটা কেমন কথা মা? নিজের মেয়েকে কী বলছো এসব?”

“ও আমার মেয়ে না ছাই। আগের জন্মে কোন পাপ করেছিলাম যার জন্য ওর জন্ম হয়েছে। কোন মুসলমানের বউ আমার মেয়ে না, আমার শুধু এখন একটাই মেয়ে তার নাম পূজা।”

ধর্মের দেয়াল

দিদি আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, “তোমার এক মেয়ে মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করলে আরেক মেয়েও শরীরে মুসলমানের রক্ত নিয়ে বেড়াচ্ছে। দেখি! তোমার ধর্মে কেমনে সয় এসব? এখন নিজের মেয়ের শরীর কেটে জাহিদের রক্ত আলাদা করো দেখি।”

আমি হাঁ করে দিদির দিকে তাকিয়ে আছি।
“মা দিদি কি বলছে এসব?”

ধর্মের দেয়াল

দিদি বললেন, “তোর শরীরে রক্তশূন্যতা। দু’ব্যাগ ব্লাড দিয়েছেন ডাক্তার। যে দুর্বল ছিলি তুই। ঝড়-বৃষ্টির রাতে ও নেগেটিভ রক্ত কই পেতাম শুনি? ভাগ্য ভালো জাহিদের সাথে ব্লাডগ্রুপ মিলেছে।”

কথাগুলো মায়ের দিকে তাকিয়ে বলেই দিদি কেবিন থেকে বের হয়ে গেলেন। মা রাগে ফোসফোস করছে। আমার চোখে জল কেন জানি

শেষ পর্ব

Our more story: শেষের পাতা 

আমরা ইউটিউব এ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *