বেওয়ারিশ পা

image_pdf

আমার বেডের পাশেই যে বেড, সেটাতে ১০ কী ১১ বছরের একটা বাচ্চা ভর্তি হয়েছে। ওর সাথে শুধু ওর মা’ই আছে। এই কদিনে আর কাউকে আসতে দেখিনি। বেশিরভাগ সময়ই ও আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রথম দিনেই জিজ্ঞেস করেছে, তুমি চশমা পরো কেনো? আমি বলেছিলাম, ঠিক মতো দেখতে পাই না, তাই। সে হেসে বলেছিলো, ও তার মানে হলো, তুমি অন্ধ? আমিও হেসে দিয়েছিলাম, হ্যাঁ। খুব মজা পেয়েছিলো সে।

কয়েকদিন আগে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা বলো তো, পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কোনটি? আমি উত্তর দিয়ে বললাম, তুমি কখনো কক্সবাজারে গিয়েছো? সে অভিমান করে বললো, না, আম্মু নিয়ে যায়নি। তবে আম্মু বলেছে, আমার পা ঠিক হলেই এবার আমাকে নিয়ে যাবে। আমি বললাম, গ্রেইট, তুমি আম্মুর হাত ধরে সমুদ্রে নামবা, একা কিন্তু নামবা না, আচ্ছা? সে সুবোধ শিশুর মতো মাথা নেড়ে বললো, আচ্ছা।

আজকে সকালে যখন পা আমার ড্রেসিং করার পর সে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, ভাল আছো রোবট ভাইয়া? আমি হেসে বললাম, হ্যাঁ, তুমি? সে বললো, আমিও ভাল আছি। আচ্ছা, যখন পা থেকে ব্যান্ডেজ খোলে, ধুয়ে দেয় তখন কি তুমি ব্যাথা পাও? আমি হেসে বললাম, না তো, কেনো? সে আমার দিকে তাকিয়ে বললো, আমি তো ব্যাথা পাই। আমি বললাম, তুমি ছোট মানুষ তো তাই। আমার মতো বড় হয়ে গেলে আর ব্যাথা পাবা না। সে হা হা হা হা করে হেসে উঠলো।

প্রায় ১২ দিন ধরে অর্থোপেডিক্স ওয়ার্ডে ভর্তি। ট্রাক উঠে গেছে পায়ের উপর দিয়ে। বেশকিছু রড, শিক ঢুকিয়ে পা দুটোকে মৃত মানুষের মতো সাদা ব্যান্ডেজে মুড়িয়ে রেখে দিয়েছেন ডাক্তার সাহেবরা। এখন আমার হাতে অঢেল সময়। অফিস নেই, ব্যস্ততাও নেই। সালেকিনকে বলে বেশ কিছু বই আনিয়েছি। ওগুলোই পড়ি। দিনে কেউ না কেউ দেখতে আসে। নানা প্রশ্নের উত্তর দেই। কিভাবে হয়েছে, আমি দেখতে পেয়েছিলাম কি না, কতদিন লাগবে সারতে এইসব হাবিজাবি কথাবার্তা। অবশ্য যারা দেখতে আসেন তারা কিছু না কিছু খাবার নিয়েই আসেন। ওয়ার্ডে যেসব বাচ্চাকাচ্চা আসে তাদেরকে দিয়ে দেই। এখানকার আয়ার একটা মেয়ে বাচ্চা আছে। ৬ বছর হবে বড়জোর। সে বেশি ঘনিষ্ঠ আমার সাথে। ওর মায়ের সাথে আসলেই সে আমার কাছে আসে। দু হাতে দুইটা আপেল কিংবা কমলা দিয়ে দেই, সে ভিষণ খুশি হয়ে তার মায়ের দিকে দৌড় দেয়। প্রতিদিন সকালে এসেই আমার কাছে আসবে।

ইন্টার্ন ডাক্তার হিসেবে যে মেয়েটা এখানে আছে সে খুব ভাল। সেদিন তার নাইট ডিউটি, সে ফলোআপ দিতে যখন আমার বেডের কাছে এসে জিজ্ঞেস করলো, কেমন আছেন? আমি বললাম, ভালো, আপনি? সে আমার হাতে বিপি গ্লাফস লাগাতে লাগাতে বললো, আমাদের আর ভাল থাকা! ১৬ ঘন্টা ডিউটি। তাই জানি না, কেমন আছি! আমি বললাম, এ বিউটিফুল মাইন্ড মুভিটা দেখেছেন? উনি আমার দিকে মাথা তুলে বললেন, না, কেনো? আমি বললাম, দেখবেন, দেখে জানাবেন কেমন লাগলো। উনি বিপি গ্লাফস খুলতে খুলতে বললেন, আপনি খুব মুভি দেখতেন? বললাম, না। যা দেখেছি তা খুবই কম, তবে ভাল মুভি দেখেছি। উনি বললেন, আচ্ছা, দেখবো। বাই দ্য ওয়ে, ওয়ার্ডের বাচ্চাগুলো নাকি আপনাকে খুব পছন্দ করে? বললাম, বাচ্চাদের একটু প্রায়োরিটি দিবেন, দেখবেন আপনাকেও পছন্দ করবে।

দুর্ঘটনার তিনদিন পরে নাকি আমার জ্ঞান ফিরেছে। জ্ঞান হয়তো শীতনিদ্রায় গিয়েছিলো। প্রথম দিনের পরের দিন থেকেই মা আছেন। বেড ছোট তাই আমার বেডের পাশেই নিচে পাটি বিছিয়ে ঘুমান। বেশিরভাগ সময়ই অশ্রুসজল চোখে আমার হাত ধরে আমার দিকে তাকান। আরেকটা যে কাজ করেন, সেটা হলো, ব্যান্ডেজ করা পা দুটোতে হাত বোলাতে থাকেন। তখন টপটপ করে পানি পড়ে তাঁর চোখ থেকে। আমি নির্বাক থাকি। কিছু সময় মানুষকে কাঁদতে দিতে হয়, বাঁধা দিতে হয় না, নইলে মানুষ দম বন্ধ হয়ে মারা যায়। মা যখন আমার দিকে তাকান তখন কেনো যেন মনে হয় চোখ ভর্তি সমবেদনা আমার দিকে। আমি চোখ বন্ধ করি। মন খারাপ করা মানুষের ফেস আমার দেখতে ভাল লাগে না।

গতকালও বড়বোনটা এসেছিল। অবশ্য মানা করে দিয়েছি যেন আগামী দুদিন না আসেন হসপিটালে। আসলেই সারাক্ষণ কান্নাকাটি। সেদিন আসছেন, চিঙড়ি মাছ রান্না করে নিয়ে। কিন্তু আমাকে খাওয়াতে পারেননি। লিকুইড ছাড়া এখন কিছু এলাউ না। এটা নিয়ে কান্নাকাটি করেছেন। ছোটবোনটা সহ্য করতে পারে না বলে সে আসেই না। সারাদিন শুধু দেখি মা’কে কল করে জিজ্ঞেস করে, আমি কী করছি, খাইছি কী না, ঘুমাচ্ছি কী না এইসব। মা কান্নাভরাট কন্ঠে উত্তর দিয়ে যায়।

সালেকিন যেদিন প্রথম আসলো এখানে, এসেই বললো, এই গনওয়ার্ডে কেনো? তুই তো এখানে থাকতে পারবি না। কেবিন নিতে হবে। আমি বললাম, কে দিবে কেবিন? একটা কেবিনের পেছনে কত মানুষ লেগে আছে, জানিস কিছু? সে বললো, কী হয়ছে? ডিএমসির আইসিইউ ম্যানেজ করে দিতে পারো তুমি, আর নিজের জন্য একটা নরমাল কেবিন ম্যানেজ করতে পারবা না, এটা বিশ্বাস করতে বলো? আমি হেসে বললাম, এটা পেয়িং বেড, ডাক্তারকে বলেছি একটা নরমাল বেড যেন একটু ম্যানেজ করে দেয়। মানে কী? সালেকিন অবাক হয়ে জানতে চাইলো। আমি বললাম, নদী কভু পান নাহি করে নিজ জল পান। আমার কথাটা ওর পছন্দ হলো না। বিড়বিড় করতে করতে বাইরে চলে গেলো। ডাক্তার মেয়েটা আজ সকালে রাউন্ডে এসে আগের মতই জিজ্ঞেস করলো, ভাল আছেন? আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললাম। আমি বললাম, মুভিটা দেখেছিলেন? উনি একটু অবাক হয়ে বললেন, ও হ্যাঁ, দেখেছি। দারুণ মুভি। ড. জন ন্যাশ। কী অদ্ভুত মানুষের জীবন, তাই না? বললাম, হুম। উনি বললেন, কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করি? আমি হেসে বললাম, করতে পারেন। যার সাথে আপনার সম্পর্ক সে জানে আপনি এখানে আছেন? না মানে, ভর্তি হবার পর থেকে আপনার পরিবারের বাইরে কাউকে দেখিনি। আপনার বোন বলেছেন, আপনি নাকি এখনো বিয়ে করেননি। তাই
বয়স হিসেবে কারো সাথে মানবিক সম্পর্ক থাকা এখনকার খুব স্বাভাবিক বিষয় একটা, তাই জিজ্ঞেস করলাম, সরি। আমি বললাম, ধুর, সরির কিছু নেই। আসলে যে ছিলো সে মাস ছয়েক হলো চলে গেছে। সে কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো, চলে গেছে মানে? আমি বললাম, চলতি ভাষায় বললে, ব্রেকআপ। সে নিরুত্তাপ হয়ে বললো- ও। তারপরও কি সে জানে না এ দুর্ঘটনার খবর? আমি বললাম, জানি না। তবে একটা জিনিস কিন্তু দুর্দান্ত হয়েছে। সে বললো, কী? বললাম সে খুব ভাগ্যবতী। চলে গিয়ে ভালই করেছে। সে যদি এখন থাকতো তবে তার অনেক কষ্ট হতো। আমার এই অবস্থা সে না পারতো মেনে নিতে, না পারতো এভোয়েড করতে। মেয়েটার অনেক কষ্ট হতো, নিদারুণ কষ্ট। ওর চোখের কাজল লেপ্টে যেতো কান্নায়। চুলগুলো হয়তো এলোমেলো হয়ে থাকতো। ঠিকমতো হয়তো খেতো না, গোসল করতো না। সারাক্ষণ হয়তো এখানেই পড়ে থাকতো। চোখের নিচে কালি জমে যেতো। চিন্তায় হয়তো শুকিয়েও যেতো। হাসতে পারা যে একটা বড় গুণ সেটাও হারিয়ে ফেলতো। মেয়েটি খুব লাকি। তাই ওর ভাগ্য খুব ফেভার করেছে। আগেই সুখের পথে হেটেছে। ডাক্তার মেয়েটি এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে দেখলাম। সে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, তাকে দেখতে ইচ্ছে করছে না এখন? আমি বললাম, আচ্ছা ডক্টর, রিপোর্টগুলো তো আজকেই দেবে। তো অপারেশনের ডিসিশন কি আজকেই নিবেন আপনারা? উনি আমার দিকে বেশ খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। পরে ফাইল গোছাতে গোছাতে বললেন, হুম।

দুপুরের পরপরই ডাক্তার মেয়েটা আবার এলো। আমি বললাম, অপারেশন কবে ডক্টর? উনি কপালের উপর থেকে চশমাটা চোখে এনে বললেন, আগামীকালই। আমি বললাম, গ্রেইট। ব্লাড কয় ব্যাগ লাগবে? সে বললো, চার ব্যাগ লাগবেই আর দু ব্যাগ ব্যাকআপ হিসেবে রাখতে হবে। আমি বললাম, আচ্ছা, আমার বন্ধু আর ভাই আসুক। ম্যানেজ করে ফেলবে ওরা। ডাক্তার মেয়েটার চোখে কিছুটা অশ্রু খেলা করছিল, শুরুতেই খেয়াল করেছিলাম। এখন স্পস্টত হলো। সে বললো, আমি ম্যানেজ করেছি। সন্ধানী থেকে কালেক্ট করবো। আমি বললাম, ওয়াও গ্রেইট, গ্রেইট। আপনার জন্য এক কাপ চা পাওনা রইলো ডক্টর। আমার অফিসের সামনের টংয়ের দোকানে খুব ভাল চা বানায়। সেখানে খাওয়াবো। উনি আমার দিকে তাকিয়েই রইলেন। ধুপ করে পাশে বসলেন। নিজের চশমাটা চোখ থেকে খুলে বাম হাতে রাখলেন। আমার দিকে স্থিরচোখে তাকিয়ে বললেন, রোবট সাহেব আপনি কী জানেন, আপনি আর কখনো হাটতে পারবেন না? আগামীকাল হাটুর নিচ থেকে দু পা-ই কেটে ফেলে হবে। আর এটা ছাড়া যে আমাদের অন্য কোন উপায় নেই! আপনি কিভাবে আর চা খাওয়াবেন?

কতক্ষণ চোখ বন্ধ করেছিলাম জানি না। চোখ খুলে দেখি উনি নেই। মা পাশে বসে পাগলের মতো কাঁদছেন। জানালা দিয়ে আকাশ দেখা যায় না, তবে সূর্যের কিছুটা বিকিরণ আসে। যা দেখে মনে হচ্ছে, বৃষ্টি হবে। অনেকদিন হয় বৃষ্টিতে ভিজি না। আজ খুব ভিজতে ইচ্ছে করছে। ছোটবেলা খুব দৌড়াদৌড়ি করে ভিজতাম বৃষ্টি এলেই। জানালার দিক থেকে চোখ সরিয়ে পায়ের দিকে তাকালাম। মৃতদেহের মতো কাফনের কাপড়ের মতো ব্যান্ডেজে মোড়ানো পা দুটি আগামীকালই দাফন হবে। পা’দুটোকে একটু ছুঁতে মন চাচ্ছে এখন।

Be the first to reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *