রাগি জামাই || পর্ব – ৮ || শেষ পর্ব

image_pdf

ভোরে ঢাকায় পৌঁছে গেলাম । অনেক দিন পর নিজের এলাকায় খুব ভালো লাগছে । সব কিছু কত আপন । প্রথমে শশুর বাড়ী নিয়ে গেলো আমাদের ।
শশুর শাশুড়ির আদর যত্নের কমতি নেই । ঠিক যেনো নিজের মা-বাবা । উনাদের আদরে লোকটার খারাপ ব্যবহার গুলো ভুলেই গিয়েছিলাম । আমিও উনাদের মেয়ের মতো হবার চেষ্টা করে যাচ্ছি । আমি চাই না আমার জন্য তাঁরা কষ্ট পাক। আমাকে পেয়ে যেনো ওনাদের পরিবারটা পরিপূর্ণ হয়েছে । নিজের ছেলের থেকে বেশি আদরের হয়ে গেলো বউমা । ওখানে তিন দিন থেকে আমাদের বাড়ি চলে আসলাম বাড়ি এসে আমি নিজের মতো করে থাকলাম ৩ দিন । এই ৬ দিন লোকটার সাথে আমার বেশি কথা হয়নি । আমরা নিজেদের মতো ব্যস্ত ছিলাম । লোকটা এসেছিলো কথা বলতে কিন্তু আমি সুযোগ দেইনি । উনার ছুটির সময় শেষ । আবার আমাদের চলে যেতে হবে । সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিলাম।

তারপর রাতের ট্রেনে রওনা দিলাম চট্টগ্রামের উদ্দেশ্যে ।
.
চুপচাপ বসে ছিলাম ‌ । উনি এসে কথা বলতে থাকে আর আমাকে হাসাতে লাগলো ।
সারারাত গল্প করতে করতে কখন যে ভোর হতে চলছে । আমরা কেউ বুঝতেই পারছিলাম না । গল্পে গল্পে ভালোলাগা বাড়তে থাকে । সকাল সকাল বাড়ি চলে আসলাম । সারারাত ঘুম হয়নি । তাই ফ্রেস হয়েই শুয়ে পড়লাম । লোকটা নিচে কি যেনো কাজ করছিলো ।
.
বিকেলে ঘুম ভাঙল । চোখ খোলতেই দেখলাম আমি লোকটার বুকে মাথা রেখে হাতে হাত রেখে শুয়ে আছি । মন ভরে দেখতে থাকলাম লোকটাকে । আহা কি মায়া যেনো সারাজীবন এই বুকে মাথা রেখে থাকতে চাই আমি ‌। এমন সময় উনার ঘুম ভাঙে । আহ্ ঘুম ভাঙ্গার আর সময় পেলো না । লজ্জায় লাল হয়ে গেলাম আমি । ওনার চোখে আমার চোখ পড়তেই চোখ নামিয়ে নিলাম আমি । মাথা নিচু করে আছি আমি ।
.
– আমার বউটা বুঝি লজ্জা পাচ্ছে
– উহু
– আচ্ছা তাহলে তো এমন কিছু করতে হবে যেনো বউটা লজ্জা পায় ।
– হুহ ঢং ।
– এখনো তো কিছুই করলাম না জানটি
– ছাড়ুন তো ।
– উহু ছাড়বো না ।
– আমার কাজ আছে ।
– আমাকে আদর করা ছাড়া অন্য কোনো কাজ নেই তোমার । ।
– এখন ছাড়ুন পরে আদর করে দিবো ।
– সত্যি তো
– হুম
– উম্মাহ ( কপালে চুমু দিলো )
.
তারপর এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে । এই নজরে লুকিয়ে আছে আমার জন্য গভীর ভালোবাসা ।

আমি যেনো হারিয়ে যাচ্ছি ওনার মাঝে ।
.
এমন দুষ্টু মিষ্টি খুনসুটি চলতে থাকে আমাদের মাঝে । আমি যেনো লোকটাকে ভালোবেসে ফেলেছি । এখন আর ওনি রাগ করে আগের মতো আচরণ করেন না । এখন ওনার বুকে মাথা না রাখলে আমার ঘুম হয় না । ওনার অফিস থেকে ফিরতে দেরী হলে কেমন যেনো নিজেকে ফাঁকা ফাঁকা লাগে । এমন ভাবেই চলে যায় ২ মাস । হঠাৎ আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি । উনি ৩ দিনের জন্য দেশের বাইরে গেছেন । উনাকে অসুস্থতার কথা জানাইনি এখনো । শুধু শুধু চিন্তা করবে তাই না বলাই ভালো । ডাক্তার আসেন আমাকে দেখতে । ওনার কথা শুনে আমি অবাক হয়ে গেলাম । আমি প্রেগন্যান্ট তাই এমন খারাপ লাগছে । এখন একটু এমন লাগবেই । খুব খুশি লাগছে আবার খারাপও লাগছিলো । আজ ওনি পাশে থাকলে খুশিতে কোলে নিয়ে নাচতো । খুব মিস করছি উনাকে । আজ খুব একা মনে হচ্ছে নিজেকে । ডাক্তার কিছু ঔষধ দিয়ে আর রেস্টে থাকতে বলেছেন । বেশি দৌড় ঝাঁপ করা নিষেধ । এইসব বলে চলে গেলেন ডাক্তার । উনি এই খবরটা শুনে খুব খুশি হবে । উনি কালকেই দেশে ফিরবেন। খুশিতে নাচতে ইচ্ছে হচ্ছে আমার । এই দিনটার জন্য উনার এতো অপেক্ষা । এইসব ভাবতে ভাবতে ঘুম আর আসছে না ঘুম আজকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে । কিভাবে উনাকে বলবো কি ভাবে বললে উনি সারপ্রাইজ হবে । এইসব ভাবতে ভাবতে ভোর হলো । আজ আমি নিজের হাতে উনাকে রান্না করে খাওয়াবো । সকাল থেকে সব কাজ শুরু করতে হবে । মনের খুশিতে রান্না শুরু করে দিলাম । বাড়ির সবাই অনেক বাঁধা দিলেও আমি মানিনী । রান্না বান্না শেষ করে । উনার আনা নীল রঙের শাড়িটা আলমারি থেকে বের করে পড়ে নিলাম । চোখে কাজল কপালে টিপ ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক । আহা আমি যেনো নিজের প্রেমে পড়ে যাবো আজ । সারা বাড়িতে রঙ্গিন রঙ্গিন মোমবাতি জ্বালিয়ে রেখেছি ‌ । বিকেল হয়ে গেছে , আজ সারাদিন উনি আমাকে একবারও ফোন করেননি । হয়তো কাজে খুব ব্যস্ত ছিলো তাই । এটা নিয়ে আর ভাবলাম না । ওনার আসার সময় হয়ে গেছে । নিজেকে খুব খুশি মনে হচ্ছে আজ । আমাদের পরিবারটা পরিপূর্ণ হতে চলেছে । ভাবতে ভাবতেই একটা ফোন আসলো । উনি হয়তো ফোন করেছেন । দৌড়ে গিয়ে ফোন ধরি আমি
.
– আপনি কি মিসেস নীলা চৌধুরী ?
– জ্বি ।
– পূর্ণ চৌধুরী কি হয় আপনার ।
– আমার স্বামী । কি হয়েছে আর আপনি কে ?
– আপনি তাড়াতাড়ি চট্টগ্রাম মেডিকেল হসপিটালে চলে আসুন ।
– আমার স্বামীর কি হয়েছে ( কান্না কন্ঠে )
– আপনি আসুন আগে ।
– হ্যালো আমার কথা শুনোন ।
– টুট টুট টুট ।( ফোন রেখে দিলো )

কি হলো ওনার । বুকের ভেতর কেমন যেনো লাগছে । দৌড়ে ছুটে গেলাম । যত সামনে এগুচ্ছি ততো হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছে । কিছু একটা হয়েছে উনার । আমি কি উনাকে হারিয়ে ফেলেছি , না না এইসব কি ভাবছি আমি ‌। উনার কিছু হবে না হতে পারে না । উনার কিছু হলে আমি কি নিয়ে বাঁচবো ভাবতে ভাবতে ওনার কেবিনের সামনে চলে আসছি ।
.
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার কেবিন থেকে বের হলেন ।।
.
– ডাক্তার ডাক্তার আমার স্বামীর কি হয়েছে । উনি এখানে কেনো ।
– দেখুন মিসেস নীলা আপনার স্বামীর রাস্তায় এক্সিডেন্ট হয়েছে সকাল বেলা। রাস্তার কিছু লোক উনাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দেন । ওনার মোবাইল থেকে আপনার নম্বর পেয়ে আমরা আপনাকে ফোন করেছি ।
– এখন কেমন আছে । বাসায় নিয়ে যেতে পারবো উনাকে?
– নো , উনার এখনো জ্ঞান ফিরেনি । মাথায় আঘাত পেয়েছে । কিছু সময় পার না হলে আমরা কিছুই বলতে পারছি না ।
– আমি একবার আমার স্বামীর কাছে যেতে পারি প্লীজ ।
– হ্যাঁ কিন্তু কান্নাকাটি করবেন না এতে পেসেন্টের সমস্যা হবে ।
– ঠিক আছে ।
বলেই চলে গেলাম উনার কাছে
.
মুখে মাস্ক পরানো । অসহায়ের মতো পড়ে আছে । কিছুক্ষণে যেনো শুকিয়ে গেছে লোকটা । আমার ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো । চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে । আজ বুঝতে পারছি ভালোবাসা কেমন হয় । উনার থেকে বেশি কষ্ট যেনো আমার হচ্ছে । নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে আমার । পাশে বসে আস্তে করে হাতটা ধরলাম ।
– আমার একা থাকতে খুব কষ্ট হয় । আপনি বাসার চলেন না । একা ঘুমাতে ভয় করে আমার ।
খুব অভিমান করে আছেন আমার সাথে তাই না । আমি আর কখনো আপনার কথার বাইরে যাবো না । আপনার রাগ তুলবো না । আমি যে আপনাকে খুব ভালোবেসে ফেলেছি ( হাত ধরে কান্না করছি )
ওনার হাত আমার পেটে নিলাম । দেখুন এটা আপনার গিফট । আপনার সন্তান । পছন্দ হয়নি গিফট ??
দয়াকরে একবার তো কথা বলুন ।
ওনার বুকের উপর শুয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লাম । কিছুক্ষণ পর উনার হাত নাড়ছে । আমি তাড়াতাড়ি ডাক্তার কে ডেকে আনলাম । ডাক্তার ভালো করে দেখলেন ।
– এতো পুরো মিরাক্কেল হয়ে গেছে । উনি এখন সম্পূর্ণ বিপদ মুক্ত । কিছুদিন রেস্ট নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে । ২/৩ দিন পর ওনাকে বাসায় নিয়ে যেতে পারবেন । আমি বসে ওনার হাত ধরে কান্না শুরু করে দিলাম । এই কান্নায় সুখ মেশানো আছে ।
.
.
. নয় মাস পর
খুব কষ্ট হচ্ছে ,, ওনি আমার হাত ধরে পাশে বসে আছেন । আমার প্রতিটা কষ্ট উনি অনুভব করছেন । চোখ দুটো লাল হয়ে আছে । আমি বুঝতে পারছিলাম উনার কষ্ট হচ্ছে খুব । কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাকে নিয়ে যাবে অপারেশন রুমে । আমি ভালো করে দেখছি মানুষটাকে । যদি কখনো না ফিরে আসি । তবে এটাই যে আমার শেষ দেখা ।
– শুনোন ।
– বলো
– ভালোবাসি আপনাকে ।
– আমিও খুব ভালোবাসি তোমাকে । তোমার কিছু হবে না দেখে নিয়ো । তোমাকে বাঁচাতে হবে আমার জন্য
আমি মাথা
নেড়ে হ্যা বললাম । আমাকে নিয়ে যাচ্ছে । আম্মু আব্বু শশুড় শাশুড়ি সবার মুখে চিন্তার ছাপ । প্রায় দুই ঘণ্টা পর আমাদের একটি ছেলে সন্তান জন্ম হলো । ঠিক উনার মতো । খুশির বাঁধ ছিলো না । সবাই খুশি , উনি তো আনন্দে নাচানাচি করছে । সবাইকে দেখে আমিও খুশি । আর কিছু চাই না আমার । জীবন চলতে থাকুক তার আপন গতিতে ।
.

=============== সমাপ্ত ===============

গল্পের সকল পর্ব একসাথেঃ

রাগি-জামাই :  পর্ব-১

রাগি-জামাই :  পর্ব-২

রাগি-জামাই :  পর্ব-৩

রাগি-জামাই :  পর্ব-৪

রাগি-জামাই :  পর্ব-৫

রাগি-জামাই :  পর্ব-৬

রাগি-জামাই :  পর্ব-৭

রাগি-জামাই :  পর্ব-৮

Be the first to reply

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *