শিউরে উঠি

image_pdf

আমার যখন পনর বছর বয়স তখন আমার মা ক্যান্সারে মারা যায়। ছোট বোনটার বয়স তখন মাত্র দুই। মেঝ বোনের তের আর একমাত্র ভাইয়ের বয়স দশ। সেটা পঁচাশি সালের কথা।

আমরা গ্রামে থাকতাম। বাবা প্রাইমারী স্কুলের মাস্টারি করতেন। চাকরীও আর কয়েকবছর ছিল। ছোট বেলা থেকেই দেখতাম মায়ের পেটে ব্যথা। মা প্রায়ই পেটের ব্যাথায় কুঁকড়ে যেত। আমি যেহেতু একটু বড় ছিলাম তাই মাকে কাজে সাহায্য করতে পারতাম। মা করতে দিত না। আমি মানা করতাম এতো কাজ করবেন না, কিন্তু মা শুনত না। কিভাবে এই ব্যথা সহ্য করত এখন মনে হলেই শিউরে উঠি!
পড়াশোনায় ভালো ছিলাম ভাইবোনেরা সবাই। আমি ফাইভ ও এইটে বৃত্তি পাই। মেঝ বোন আয়শাও বৃত্তি পায়। সামনে আমার মেট্রিক পরীক্ষা। বাবা কতবার শহরে নিয়ে যেতে চেয়েছে মাকে! কিন্তু মা যায় নি। আসলে মা ভয় পেত। শহরে গেলেই চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা লাগবে বাবা হয়তো জমিজমা সব বিক্রি করে হলেও চিকিৎসা করাবে।
আমাদের গ্রামটা অত্যন্ত প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রাম। গাড়ির রাস্তা ছিল না। নৌকা করে যেতে হত। এখন অবশ্য রাস্তা হয়েছে। একরাতে যখন ব্যথা বেশী উঠল মা চিৎকার করতো লাগলো। আমরা ভাই বোনেরা সবাই ঘুম থেকে উঠে গেলাম। আমাদের গ্রামে তখন কারেন্ট ছিল না। কুপি জ্বালালাম। শহরে যেতে নৌকা লাগবে তারপর সেখান থেকে ঢাকা। মেঘনা নদীর পাড়ে নরসিংদীর একটা গ্রাম। অনেক চেষ্টা করেও এতো রাতে বাবা নৌকা পেল না। আমরা সেই রাত মাকে নিয়ে বসে থাকলাম কুপির আগুনে। ছোট বোনকে আয়শা সামলালো। ব্যথা সহ্য করতে করতে মা মনে হয় অজ্ঞানই হয়ে গেল।
পরদিন সকালে নৌকার ব্যবস্থা করা হলো। বাবার সাথে শুধু আমি গেলাম। বাবা চাননি আমি জোর করেই গেলাম। ভাইবোনকে জরিনা খালার কাছে রেখে আমরা বাবা মেয়ে রওনা হলাম। নরসিংদী শহরে তখন আতিক ডাক্তারের অনেক নাম। ঢাকা মেডিকেলের ডাক্তার। মাকে ওনাকে দেখালাম, উনি কি বুঝলো জানি না বল্লো এখনই ঢাকা নিয়ে যান। আপনারা অনেক দেরী করে ফেলেছেন!
এই কথা শুনে বাবা দিশাহারা হয়ে গেল। আমি সাথে সাথে বাবার হাতটা ধরলাম। বল্লাম চল বাবা। দেখি কি হয়। ভয় পেয়ো না। জানিনা হঠাৎ আমার এতো শক্তি কোথা থেকে এলো!
ঢাকায় তখন এতো বেসরকারী হাসপাতাল ছিল না। হাসপাতাল বলতে সবাই ঢাকা মেডিকেলই বুঝত। তো ঢাকা মেডিকেল নিয়ে মাকে ভর্তি করালাম। দুইদিন ধরে মায়ের জ্ঞানই ফিরলো না। তৃতীয় দিন এসে ডাক্তার বল্লেন মায়ের নাকি জরায়ু ক্যান্সার হয়েছে। লাস্ট স্টেজ। আর কিছুই নাকি করার নাই। অথচ আমার ধারনা ছিল মায়ের একটা অসুখ হয়ত হয়েছে কিন্তু চিকিৎসা করলে নিশ্চয়ই ভালো হয়ে যাবে। দশদিন জমে মানুষে টানাটানি করে মা আমার পরপারে চলে গেল। একবার চোখ খুলে আমার আর বাবার সাথে কথা বলেছে,
— রাবু তুই বড় বোন। তোর ভাই বোনদেরকে দেখিস। ওদেরকে আমার অভাব বুঝতে দিস না।
— মা, মাগো আমি সবাইকে দেখে রাখবো তুমি এভাবে বলো না
— তোর বাবাকেও দেখে রাখিস। তারপর বাবাকে ডাকলেন।
— আমাকে মাফ করে দিয়েন রাবুর বাবা। ছেলে মেয়ে বড় হয়ে গেলে আপনারে কে দেখা শুনা করবে? আপনি তখন একটা বিয়ে কইরেন!
— বাবা মায়ের মুখে এই কথা শুনে অঝোরে কাঁদতে লাগলো! আমি এই প্রথম বাবাকে কাঁদতে দেখলাম!আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল!!
দশদিন পর আমরা মায়ের লাশ নিয়ে গ্রামে ফিরলাম। মাকে দাফন করা হলো। কিছুদিন যেন আমরা ঘোরের ভেতর ছিলাম, কি হয়ে গেল! কি হারালাম!! আস্তে আস্তে পরিবেশ স্বাভাবিক হতে লাগলো। মেঝ বোন আয়শা আর ভাই নয়নকে পড়াতাম আমি। ছোট বোন মুমুকে নিয়ে প্রথম প্রথম সমস্যা হলেও আস্তে আস্তে সামলানো শিখে যাই আমি। আমি যেন বড় বোন থেকে মা হয়ে উঠলাম!
সকাল পাঁচটায় উঠতাম। রান্না করতাম তারপর পড়তে বসতাম। সামনে আমার মেট্রিক পরীক্ষা। বাবাকে স্কুলে পাঠিয়ে দিতাম। আয়শা আর নয়ন স্কুলে গেলে পাশের বাড়ির বিধবা জরিনা খালা দেখে রাখতো। আমার বাবা ছিলেন দাদা দাদীর একমাত্র সন্তান। তাই আমাদের ভিটেটা অনেক বড় ছিল। খুব ভালো পরীক্ষা দিলাম আমি। দেখতে দেখতে আমার মেট্রিকের রেজাল্ট বেরুল। আমি প্রথম শ্রেনীতে পাশ করলাম। বাবা বল্লেন যা শহরে গিয়ে সরকারি কলেজে ভর্তি হ। কিন্তু মুমু তখনো ছোট। আমি গ্রামেরই একটা কলেজে ভর্তি হলাম। সরকারি না হলেও যথেষ্ঠ নামডাক ছিল কলেজের। ইন্টারমিডিয়েটও তেও প্রথম শ্রেণী পেলাম।
ততদিনে বাবা রিটায়ার্ড করেছে। বাবা আমাকে বল্লো, চল রাবু আমরা সবাই ঢাকায় চলে যাই। যা টাকা পেয়েছি তা দিয়ে ছোট একটা জায়গা কিনে বাড়ি করবো তখন জায়গার দামও এত আকাশছোঁয়া ছিল না। বাবা তার এক আত্মীয়র মাধ্যমে মালিবাগে তিন কাঠার একটা জায়গা কিনলো। আর টিন দিয়ে একটা ঘর বানালো। আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়ে গেলাম। আয়শা তখন কলেজে। নয়ন নাইনে। দিনে ক্লাস করতাম। সন্ধায় আয়শা আর নয়নকে পড়াতাম। জরিনা খালা আমাদের সাথে ঢাকায় চলে এলো। মুমুও এখন আর ছোট নেই। এভাবেই বার (১২) বছর কেটে গেল। আমি বিসিএস দিয়ে একটা সরকারি কলেজে চাকরি করছি। আয়শাকে মেডিকেলে ভর্তি করিয়েছি। এখন আয়শা ডাক্তার। নয়ন বুয়েটে চান্স পেয়েছে আর মুমু কলেজে পড়ে। এর মধ্যে বাবা আমাকে কতবার বলেছে বিয়ে করতে কিন্তু আমি করিনি। আমার কলেজের কলিগ আনোয়ার আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছে। বাবার কাছে প্রস্তাবও দিয়েছে। আমি না করে দিয়েছি। কারন আমার দ্বায়িত্ব যে এখনো শেষ হয়নি। যদি অপেক্ষা করতে পারে তবেই বিয়ে হবে। আমার দৃঢ়তা দেখে একসময় আনোয়ার আমার সব শর্তে রাজি হয়। অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। আমার আসলে নিজেকে নিয়ে ভাবার মানসিকতা ছিল না তখন।
আনোয়ারও আমার দ্বায়িত্ব ভাগ করে নিতে চায়। আনোয়ার আমাকে কিছু করতে দিত না, সব কিছুর খেয়াল সে রাখতো। যতদিন সবাইকে প্রতিষ্ঠিত না করতে পারি আমি বাবার সাথেই থেকেছি। একে একে সবার বিয়ে দিলাম। সবাই এখন প্রতিষ্ঠিত। নয়ন বিদেশে চলে গেছে। বয়সটাও আমার এখন বেড়েছে। আনোয়ারে মা আনোয়ারকে বিয়ের জন্য চাপ দেয়ায় আনোয়ার বিদেশে চলে গিয়েছে।
বাড়িটায় বাবা একা একা থাকতে পারেনা প্রায়ই এই কথা বলেন আমাকে। বাবা গ্রামে গিয়ে থাকতে চাইলেন। শহর উনার ভালো লাগে না। আয়শা বাবার সাথে থাকতে চাইলো কিন্তু বাবা বল্লেন স্বামী যেখানে আছে সেখানেই থাকো। আমরা কি করবো বুঝে উঠতে পারছি না। এদিকে উনি আমাদের সাথেও থাকবেন না। সিদ্ধান্ত নিলাম বাবাকে আমরা একটা বিয়ে করাব। অনেক বুঝিয়ে রাজিও করালাম। কারন গ্রামে এতো বড় বাড়িতে উনি একা একা কিভাবে থাকবেন! বিধবা ও নিঃসন্তান একজন মহিলার সাথে বাবার বিয়ে হলো। সাক্ষী হলাম আমরা ছেলেমেয়েরা। সেই মহিলা মানে আমাদের বাবার ২য় স্ত্রী আমাদেরকে খুব আপন করে নিল। আমরাও খুশি হলাম যে তিনি বাবাকে অনেক আদর যত্ন করেন। খেয়াল রাখেন।
এক বছর পর বাবা জানালেন আমাদের সেই নতুন মা শর্ত দিয়েছে তার নামে সব সম্পত্তি লিখে দিতে হবে তা না হলে তিনি বাবার সাথে থাকবেন না। বাবা কিছুতেই এই শর্তে রাজি হলেন না তাই তিনি (নতুন মা) কাউকে কিছু না বলে চলে গেছেন। কিন্তু আমরা আর গ্রাম থেকে বাবাকে কিছুতেই ঢাকায় আনতে পারলাম না। তিনি গ্রামেই থেকে গেলেন। নয়ন অনেক বার বাবাকে বিদেশে নিয়ে যেতে চেয়েছে। বাবা রাজি হন নি। আমার সব সময় দুঃশ্চিন্তা হতো বাবার জন্য। বাবা সব সময় তার সব ছেলেমেয়েকে চিঠি লিখতেন এবং আমরাও সেই চিঠির উত্তর দিতাম যতই এখন ইন্টারনেটের যুগ হোক না কেন!
বাবার মৃতদেহের কাছে দাঁড়িয়ে রাবু এতোক্ষন এগুলো ভাবছিল কত বছর আগের ঘটনা কিন্তু মনে হচ্ছিল সব ঘটনা চোখের সামনে ভেসে উঠলো এক নিমিষেই!! বাবা তুমি ওপারে মায়ের সাথে ভালো থেকো। আমি মাকে দেয়া কথা রাখতে পেরেছি…ভাই বোন সবাইকে মানুষ করতে পেরেছি।
হঠাৎই দেখলাম একটা হাত আমার হাতকে শক্ত করে চেপে ধরলো। আমি ফিরে তাকালাম। আনোয়ার!! তুমি???
– হ্যাঁ আমি
– আমাদের তো অনেক সময় পেরিয়ে গেছে এখন।
– তবুও আমি এখনো তোমাকেই চাই! চলো বুড়ো বুড়ি বিয়ে করে ফেলি! আনোয়ার এটা বলে আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে লাগলো! কি সুন্দর সেই হাসি, এতোদিন খেয়াল করিনি তো এভাবে!!
– রাবু কিছু বলতে পারে না ওর গলা ধরে আসে!
আনোয়ার রাবুর উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে আছে…….
# ছোট_গল্প

Please Rate This Post
[Total: 1 Average: 5]

You may also like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *