image_pdf

সোনার তরী – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

গনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা। কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা। রাশি রাশি ভারা ভারা ধান-কাটা হল সারা, ভরা নদী ক্ষুরধারা খরপরশা– কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা॥ একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা— চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা। পরপারে দেখি আঁকা তরুছায়ামসী-মাখা গ্রামখানি মেঘে ঢাকা […]

যেতে নাহি দিব – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি ; বেলা দ্বিপ্রহর ; হেমন্তের রৌদ্র ক্রমে হতেছে প্রখর । জনশূন্য পল্লিপথে ধূলি উড়ে যায় মধ্যাহ্ন-বাতাসে ; স্নিগ্ধ অশত্থের ছায় ক্লান্ত বৃদ্ধা ভিখারিণী জীর্ণ বস্ত্র পাতি ঘুমায়ে পড়েছে ; যেন রৌদ্রময়ী রাতি ঝাঁ ঝাঁ করে চারি দিকে নিস্তব্ধ নিঃঝুম — শুধু মোর […]

যাবার দিন – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই – যা দেখেছি, যা পেয়েছি, তুলনা তার নাই। এই জ্যোতিসমুদ্র মাঝে       যে শতদল পদ্ম রাজে তারি মধু পান করেছি, ধন্য আমি তাই। যাবার দিনে এই কথাটি জানিয়ে যেন যাই।। বিশ্বরূপের খেলাঘরে কতই গেলেম খেলে, অপরূপকে দেখে […]

অনন্ত প্রেম – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তোমারেই যেন ভালোবাসিয়াছি শত রূপে শত বার জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার। চিরকাল ধরে মুগ্ধ হৃদয় গাঁথিয়াছে গীতহার, কত রূপ ধরে পরেছ গলায়, নিয়েছ সে উপহার জনমে জনমে, যুগে যুগে অনিবার। যত শুনি সেই অতীত কাহিনী, প্রাচীন প্রেমের ব্যথা, অতি পুরাতন বিরহমিলনকথা, অসীম অতীতে চাহিতে […]

সমালোচক – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

বাবা নাকি বই লেখে সব নিজে। কিছুই বোঝা যায় না লেখেন কী যে! সেদিন পড়ে শোনাচ্ছিলেন তোরে, বুঝেছিলি? – বল্‌ মা, সত্যি করে। এমন লেখায় তবে বল্‌ দেখি কী হবে।। তোর মুখে মা, যেমন কথা শুনি তেমন কেন লেখেন নাকো উনি। ঠাকুরমা কি বাবাকে কক্‌খনো […]

মেঘের পরে মেঘ জমেছে – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মেঘের পরে মেঘ জমেছে, আঁধার করে আসে- আমায় কেন বসিয়ে রাখ একা দ্বারের পাশে। কাজের দিনে নানা কাজে থাকি নানা লোকের মাঝে, আজ আমি যে বসে আছি তোমারই আশ্বাসে। আমায় কেন বসিয়ে রাখ একা দ্বারের পাশে। তুমি যদি না দেখা দাও কর আমায় হেলা, কেমন […]

সোজাসুজি – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

হৃদয়-পানে হৃদয় টানে, নয়ন-পানে নয়ন ছোটে- দুটি প্রাণীর কাহিনীটা এইটুকু বৈ নয়কো মোটে। শুক্লসন্ধ্যা চৈত্রমাসে হেনার গন্ধ হাওয়ায় ভাসে, আমার বাঁশি লুটায় ভূমে, তোমার কোলে ফুলের পুঁজি- তোমার আমার এই-যে প্রণয় নিতান্তই এ সোজাসুজি।। বসন্তীরঙ বসনখানি নেশার মতো চক্ষে ধরে, তোমার গাঁথা যূথীর মালা স্তুতির […]

মৃত্যুর পরে – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আজিকে হয়েছে শান্তি , জীবনের ভুলভ্রান্তি সব গেছে চুকে । রাত্রিদিন ধুক্‌ধুক্‌ তরঙ্গিত দুঃখসুখ থামিয়াছে বুকে । যত কিছু ভালোমন্দ যত কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব কিছু আর নাই । বলো শান্তি , বলো শান্তি , দেহ-সাথে সব ক্লান্তি হয়ে যাক ছাই । গুঞ্জরি করুক তান ধীরে ধীরে […]

হিং টিং ছট্ – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

স্বপ্ন দেখেছেন রাত্রে হবুচন্দ্র ভূপ — অর্থ তার ভাবি ভাবি গবুচন্দ্র চুপ। শিয়রে বসিয়ে যেন তিনটে বাদঁরে উকুন বাছিতেছিল পরম আদরে — একটু নড়িতে গেলে গালে মারে চড় , চোখে মুখে লাগে তার নখের আঁচড় । সহসা মিলালো তারা , এল এক বেদে, ‘পাখি উড়ে […]

আমাদের ছোট নদী – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে। পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি, দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি। চিক্ চিক্ করে বালি, কোথা নাই কাদা, একধারে কাশবন ফুলে ফুলে সাদা। কিচিমিচি করে সেথা শালিকের ঝাঁক, রাতে ওঠে […]

১৪০০ সাল – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আজি হতে শতবর্ষ পরে কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি কৌতুহলভরে, আজি হতে শতবর্ষ পরে! আজি নব বসন্তের প্রভাতের আনন্দের লেশমাত্র ভাগ, আজিকার কোনো ফুল, বিহঙ্গের কোনো গান, আজিকার কোনো রক্তরাগ- অনুরাগে সিক্ত করি পারিব কি পাঠাইতে তোমাদের করে, আজি হতে শতবর্ষ পরে? তবু তুমি […]

আমার মাঝে তোমার লীলা হবে – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমার মাঝে তোমার লীলা হবে, তাই তো আমি এসেছি এই ভবে। এই ঘরে সব খুলে যাবে দ্বার, ঘুচে যাবে সকল অহংকার, আনন্দময় তোমার এ সংসার আমার কিছু আর বাকি না রবে। মরে গিয়ে বাঁচব আমি, তবে আমার মাঝে তোমার লীলা হবে। সব বাসনা যাবে আমার […]

আগমন – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তখন রাত্রি আঁধার হল, সাঙ্গ হল কাজ – আমরা মনে ভেবেছিলেম, আসবে না কেউ আজ | মোদের গ্রামে দুয়ার যত রুদ্ধ হল রাতের মত, দু’এক জনে বলেছিল “আসবে মহারাজ! আমরা হেসে বলেছিলেম “আসবে না কেউ আজ!” দ্বারে যেন আঘাত হল শুনেছিলেম সবে, আমরা তখন বলেছিলেম […]

মাস্টার বাবু – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

আমি আজ কানাই মাস্টার, বড় মোর বেড়াল ছানাটি আমি ওকে মারি নে মা বেত, মিছিমিছি বসি নিয়ে কাঠি। রোজ রোজ দেরি করে আসে, পড়াতে দেয় না ও তো মন, ডান পা তুলিয়ে তোলে হাই, যত আমি বলি ‘শোন, শোন’। দিনরাত খেলা খেলা খেলা, লেখা পড়ায় […]

পুরাতন ভৃত্য – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ভূতের মতন চেহারা যেমন র্নিবোধ অতি ঘোর— যা- কিছু হারায়, গিন্নি বলেন, “কেষ্ট বেটাই চোর।” উঠিতে বসিতে করি বাপান্ত, শুনেও শোনে না কানে। যত পায় বেত না পায় বেতন, তবু না চেতন মানে। বড় প্রয়োজন, ডাকি প্রাণপণ চীত্কার করি ‘কেষ্টা’— যত করি তাড়া নাহি পাই […]