অপ্রকাশিত ভালোবাসা

কোন এক বসন্তের প্রাণবন্ত সকাল। অনির্দিষ্টের মতো ছেলেটা একটা শপিং কমপ্লেক্সের ভিতর এদিক-সেদিক ঘোরাঘুরি করতে থাকে। একসময় তার চোখ পড়ে যায় একটা CD-স্টোরের কাউন্টারে দাঁড়ানো খুব সুন্দর একটা মেয়ের দিকে। মেয়ের হাসিটা ছিল অপূর্ব রকমের সুন্দর , ছেলেটা প্রথম দেখায় মেয়েটার প্রেমে পড়ে যায়। এটাই মনে হয়, Love At First Sight.

ছেলেটা সামনে এগিয়ে একটা CD নিয়ে মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দেয়।

ছেলেটা: “আমি এই CD-টা কিনতে চাচ্ছিলাম।”

মেয়েটা: (হাসিমুখে) “তুমি চাইলে আমি এটা তোমার জন্য সুন্দর দেখে একটা প্যাকেটে Wrapping করে দিতে পারি।”

ছেলেটা মাথা নিচু করে সম্মতি জানায়।

মেয়েটা কিছুক্ষনের মধ্যে শপ-এর ভিতর থেকে CD-টা Wrapping করে নিয়ে আসে। ছেলেটা CD-টা নিয়ে বাসায় চলে যায়। এরপর থেকে ছেলেটা প্রতিদিন CD-শপে এসে একটা করে CD কিনতে থাকে। মেয়েটা আগের মতোই তা Wrapping করে দেয়। ছেলেটা Wrapping করা CD নিয়ে গিয়ে বাসায় তার সেল্ফ-এ রেখে দেয়। ছেলেটা অনেক চেষ্টা করে মেয়েটাকে তার ভালোলাগার কথা বলার, কিন্তু তা বলতে পারে না। ছেলেটার মা একসময় বিষয়টা জানতে পারে। তখন তিনি তার ছেলেকে পরামর্শ দেন সাহস করে মুখ ফুটে একবার কথাটা বলে দেখতে।

পরদিন ছেলেটা আবার CD-শপে যায়। প্রতিদিনের মতো সে আজও একটা CD কেনে। ছেলেটা ভালোলাগার কথা বলার চেষ্টা করে এবং আজও ব্যর্থ হয়। মেয়েটা CD-টা Wrapping করার জন্য ভিতরে চলে যায়। এমন সময় ছেলেটার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলা করে। সে সাথে সাথে একটা কাগজের মধ্যে লিখে, “কেন জানি তোমাকে আমার অসম্ভব রকমের ভালো লেগে গেছে। আমরা কি আগামি পরশুদিন বিকালে কফিশপে দেখা করতে পারি।” লেখাটার নিচে সে তার নাম ও ফোন নাম্বার লিখে রাখে। এরপর কাগজটা মেয়েটার ডেস্কের উপর রেখে ছেলেটা দৌড়ে চলে যায় CD-শপ থেকে।

পরশুদিন বিকাল। এক ঘন্টা ধরে মেয়েটা কফিশপে অপেক্ষা করছে ছেলেটার জন্য। ছেলেটার অনুপস্থিতি দেখে একসময় মেয়েটা ডায়াল করে ছেলেটার ফোন নাম্বারে। ছেলেটার মা ফোন রিসিভ করে।

– “হ্যালো”

— “জন আছে? ওকে একটু দেওয়া যাবে?”

– “কে বলছো তুমি?”

— “আমি মারিয়া”

– “মারিয়া, তুমি কি জান না ‘জন’ গতকাল রোড অ্যাক্সিডেন্টে ………”

ছেলেটার মা আর কথা কমপ্লিট করতে পারেন না, তার দুইচোখ বেয়ে কান্না চলে আসে। তিনি ধীরে ধীরে তার মৃত ছেলের রুমে যান। একসময় তার চোখ পড়ে যায় ছেলেটার সেল্ফ-এর উপর সাজিয়ে রাখা অসংখ্য Wrapping করা CD-এর উপর। তিনি অবাক হয়ে দেখেন যে একটা CD-ও Wrapping করা অবস্থা থেকে খোলা হয়নি।

তিনি একটা CD হাতে নিয়ে Unwrapped করেন। CD-এর ভিতর একটা কাগজ খুঁজে পান তিনি। তাতে লেখা আছে, “কেন জানি তোমাকে আমার অসম্ভব রকমের ভালো লেগে গেছে। আমরা কি কোন একদিন বিকালে কফিশপে দেখা করতে পারি – ‘মারিয়া’।

সাথে সাথে তিনি আর একটা CD হাতে নিয়ে Unwrapped করেন। আবার এই CD-এর ভিতরেও তিনি আর একটা কাগজ খুঁজে পান। তাতে লেখা আছে, “কেন জানি তোমাকে আমার অসম্ভব রকমের ভালো লেগে গেছে। আমরা কি কোন একদিন বিকালে কফিশপে দেখা করতে পারি – ‘মারিয়া’।




Buddhadeb Bosu

মুক্তিযুদ্ধের কবিতা – বুদ্ধদেব বসু

আজ রাত্রে বালিশ ফেলে দাও, মাথা রাখো পরস্পরের বাহুতে,
শোনো দূরে সমুদ্রের স্বর, আর ঝাউবনে স্বপ্নের মতো নিস্বন,
ঘুমিয়ে পোড়ো না, কথা ব’লেও নষ্ট কোরো না এই রাত্রি-
শুধু অনুভব করো অস্তিত্ব।

কেন না কথাগুলোকে বড়ো নিষ্ঠুরভাবে চটকানো হ’য়ে গেছে,
কোনো উক্তি নির্মল নয় আর, কোনো বিশেষণ জীবন্ত নেই;
তাই সব ঘোষণা এত সুগোল, যেন দোকানের জানালায় পুতুল-
অতি চতুর রবারে তৈরি, রঙিন।

কিন্তু তোমরা কেন ধরা দেবে সেই মিথ্যায়, তোমরা যারা সম্পন্ন,
তোমরা যারা মাটির তলায় শস্যের মতো বর্ধিষ্ণু?
বোলো না ‘সুন্দর’, বোলো না ‘ভালোবাসা’, উচ্ছ্বাস হারিয়ে ফেলো না
নিজেদের-
শুধু আবিষ্কার করো, নিঃশব্দে।

আবিষ্কার করো সেই জগৎ, যার কোথাও কোনো সীমান্ত নেই,
যার উপর দিয়ে বাতাস ব’য়ে যায় চিরকালের সমুদ্র থেকে,
যার আকাশে এক অনির্বাণ পুঁথি বিস্তীর্ণ-
নক্ষত্রময়, বিস্মৃতিহীন।

আলিঙ্গন করো সেই জগৎকে, পরষ্পরের চেতনার মধ্যে নিবিড়।
দেখবে কেমন ছোটো হ’তেও জানে সে, যেন মুঠোর মধ্যে ধ’রে যায়,
যেন বাহুর ভাঁজে গহ্বর, যেখানে তোমরা মুখ গুঁজে আছো
অন্ধকারে গোপনতায় নিস্পন্দ-

সেই একবিন্দু স্থান, যা পবিত্র, আক্রমণের অতীত,
যোদ্ধার পক্ষে অদৃশ্য, মানচিত্রে চিহ্নিত নয়,
রেডিও আর হেডলাইনের বাইরে সংঘর্ষ থেকে উত্তীর্ণ-
যেখানে কিছুই ঘটে না শুধু আছে সব

সব আছে- কেননা তোমাদেরই হৃদয় আজ ছড়িয়ে পড়লো
ঝাউবনে মর্মর তুলে, সমুদ্রের নিয়তিহীন নিস্বনে,
নক্ষত্র থেকে নক্ষত্রে, দিগন্তের সংকেতরেখায়-
সব অতীত, সব ভবিষ্যৎ আজ তোমাদের।

আমাকে ভুল বুঝোনা। আমি জানি, বারুদ কত নিরপেক্ষ,
প্রাণ কত বিপন্ন।
কাল হয়তো আগুন জ্বলবে দারুণ, হত্যা হবে লেলিহান,
যেমন আগে, অনেকবার, আমাদের মাতৃভুমি এই পৃথিবীর
মৃত্তিকায়-
চাকার ঘূর্ণনের মতো পুনরাবৃত্ত।

তবু এও জানি ইতিহাস এক শৃঙ্খল, আর আমরা চাই মুক্তি,
আর মুক্তি আছে কোন পথে, বলো, চেষ্টাহীন মিলনে ছাড়া?
মানুষের সঙ্গে মানুষের মিলন, মানুষের সঙ্গে বিশ্বের-
যার প্রমাণ, যার প্রতীক আজ তোমরা।

নাজমা, শামসুদ্দিন, আর রাত্রির বুকে লুকিয়ে-থাকা যত প্রেমিক,
যারা ভোলোনি আমাদের সনাতন চুক্তি, সমুদ্র আর নক্ষত্রের সঙ্গে,
রচনা করেছো পরস্পরের বাহুর ভাঁজে আমাদের জন্য
এক স্বর্গের আভাস, অমরতায় কল্পনা :

আমি ভাবছি তোমাদের কথা আজকের দিনে, সারাক্ষণ-
সেই একটি মাত্র শিখা আমার অন্ধকারে, আমার চোখের সামনে
নিশান।
মনে হয় এই জগৎ-জোড়া দুর্গন্ধ আর অফুরান বিবমিষার বিরুদ্ধে
শুধু তোমরা আছো উত্তর, আর উদ্ধার।




আমার কুঁড়েঘরে – হুমায়ুন আজাদ

আমার কুঁড়েঘরে নেমেছে শীতকাল
তুষার জ’মে আছে ঘরের মেঝে জুড়ে বরফ প’ড়ে আছে
গভীর ঘন হয়ে পাশের নদী ভ’রে
বরফ ঠেলে আর তুষার ভেঙে আর দু-ঠোঁটে রোদ নিয়ে
আমার কুঁড়েঘরে এ-ঘন শীতে কেউ আসুক
আমার গ্রহ জুড়ে বিশাল মরুভূমি
সবুজ পাতা নেই সোনালি লতা নেই শিশির কণা নেই
ঘাসের শিখা নেই জলের রেখা নেই

আমার মরুভূর গোপন কোনো কোণে একটু নীল হয়ে
বাতাসে কেঁপে কেঁপে একটি শীষ আজ উঠুক
আমার গাছে গাছে আজ একটি কুঁড়ি নেই
একটি পাতা নেই শুকনো ডালে ডালে বায়ুর ঘষা লেগে
আগুন জ্ব’লে ওঠে তীব্র লেলিহান
বাকল ছিঁড়েফেড়ে দুপুর ভেঙেচুরে আকাশ লাল ক’রে
আমার গাছে আজ একটা ছোট ফুল ফুটুক
আমার এ-আকাশ ছড়িয়ে আছে ওই
পাতটিনের মতো ধাতুর চোখ জ্বলে প্রখর জ্বালাময়
সে-তাপে গ’লে পড়ে আমার দশদিক
জল ও বায়ুহীন আমার আকাশের অদেখা দূর কোণে
বৃষ্টিসকাতর একটু মেঘ আজ জমুক
আমার কুঁড়েঘরে নেমেছে শীতকাল
তুষার জ’মে আছে ঘরের মেঝে জুড়ে বরফ প’ড়ে আছে
গভীর ঘন হয়ে পাশের নদী ভ’রে
বরফ ঠেলে আর তুষার ভেঙে আজ দু-ঠোঁটে রোদ নিয়ে
আমার কুঁড়েঘরে এ-ঘন শীতে কেউ আসুক।




ভালো থেকো – হুমায়ুন আজাদ

ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো।
ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালি গান, ভালো থেকো।
ভালো থেকো মেঘ, মিটিমিটি তারা।
ভালো থেকো পাখি, সবুজ পাতারা।
ভালো থেকো।

ভালো থেকো চর, ছোট কুড়ে ঘর, ভালো থেকো।
ভালো থেকো চিল, আকাশের নীল, ভালো থেকো।
ভালো থেকো পাতা, নিশির শিশির।
ভালো থেকো জল, নদীটির তীর।
ভালো থেকো গাছ, পুকুরের মাছ, ভালো থেকো।
ভালো থেকো কাক, কুহুকের ডাক, ভালো থেকো।
ভালো থেকো মাঠ, রাখালের বাশিঁ।
ভালো থেকো লাউ, কুমড়োর হাসি।
ভালো থেকো আম, ছায়া ঢাকা গ্রাম, ভালো থেকো।
ভালো থেকো ঘাস, ভোরের বাতাস, ভালো থেকো।
ভালো থেকো রোদ, মাঘের কোকিল,
ভালো থেকো বক, আড়িয়ল বিল,
ভালো থেকো নাও, মধুমতি গাও,ভালো থেকো।
ভালো থেকো মেলা, লাল ছেলেবেলা, ভালো থেকো।
ভালো থেকো, ভালো থেকো, ভালো থেকো।




Rabindranath Tagore

যাবার দিন – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

যাবার দিনে এই কথাটি বলে যেন যাই –
যা দেখেছি, যা পেয়েছি, তুলনা তার নাই।
এই জ্যোতিসমুদ্র মাঝে       যে শতদল পদ্ম রাজে
তারি মধু পান করেছি, ধন্য আমি তাই।
যাবার দিনে এই কথাটি জানিয়ে যেন যাই।।

বিশ্বরূপের খেলাঘরে কতই গেলেম খেলে,
অপরূপকে দেখে গেলেম দুটি নয়ন মেলে।
পরশ যাঁরে যায় না করা     সকল দেহে দিলেন ধরা,
এইখানে শেষ করেন যদি শেষ করে দিন তাই –
যাবার বেলা এই কথাটি জানিয়ে যেন যাই।।




Jibanananda Das

নীলিমা – জীবনানন্দ দাশ

রৌদ্র ঝিল্‌মিল,
উষার আকাশ, মধ্য নিশীথের নীল,
অপার ঐশ্বর্যবেশে দেখা তুমি দাও বারে বারে
নিঃসহায় নগরীর কারাগার-প্রাচীরের পারে!
-উদ্বেলিছে হেথা গাঢ় ধূম্রের কুণ্ডলী,
উগ্র চুল্লিবহ্নি হেথা অনিবার উঠিতেছে জ্বলি,
আরক্ত কঙ্করগুলো মরুভূর তপ্তশ্বাস মাখা,
মরীচিকা-ঢাকা!

অগণন যাত্রিকের প্রাণ
খুঁজে মরে অনিবার, পায় নাকো পথের সন্ধান;
চরণে জড়ায়ে গেছে শাসনের কঠিন শৃঙ্খল-
হে নীলিমা নিষ্পলক, লক্ষ বিধিবিধানের এই কারাতল
তোমার ও মায়াদণ্ডে ভেঙেছ মায়াবী।
জনতার কোলাহলে একা ব’সে ভাবি
কোন্ দূর জাদুপুর-রহস্যের ইন্দ্রজাল মাখি
বাস্তবের রক্ততটে আসিলে একাকী!
স্ফটিক আলোকে তব বিথারিয়া নীলাম্বরখানা
মৌন স্বপ্ন-ময়ূরের ডানা!
চোখে মোর মুছে যায় ব্যাধবিদ্ধ ধরণীর রুধির-লিপিকা
জ্বলে ওঠে অন্তহারা আকাশের গৌরী দীপশিখা!
বসুধার অশ্রু-পাংশু আতপ্ত সৈকত,
ছিন্নবাস, নগ্নশির ভিক্ষুদল, নিষ্করুণ এই রাজপথ,
লক্ষ কোটি মুমূর্ষুর এই কারাগার,
এই ধূলি-ধূম্রগর্ভ বিস্তৃত আঁধার
ডুবে যায় নীলিমায়-স্বপ্নায়ত মুগ্ধ আঁখিপাতে,
-শঙ্খশুভ্র মেঘপুঞ্জে , শুক্লাকাশে, নক্ষত্রের রাতে;
ভেঙে যায় কীটপ্রায় ধরণীর বিশীর্ণ নির্মোক,
তোমার চকিত স্পর্শে, হে অতন্দ্র দূর কল্পলোক!




Purnendu Patri

কথোপকথন-৪ – পূর্ণেন্দু পত্রী

– যে কোন একটা ফুলের নাম বল
– দুঃখ ।
– যে কোন একটা নদীর নাম বল
– বেদনা ।
– যে কোন একটা গাছের নাম বল
– দীর্ঘশ্বাস ।
– যে কোন একটা নক্ষত্রের নাম বল
– অশ্রু ।
– এবার আমি তোমার ভবিষ্যত বলে দিতে পারি ।
– বলো ।
– খুব সুখী হবে জীবনে ।
শ্বেত পাথরে পা ।
সোনার পালঙ্কে গা ।
এগুতে সাতমহল
পিছোতে সাতমহল ।
ঝর্ণার জলে স্নান
ফোয়ারার জলে কুলকুচি ।
তুমি বলবে, সাজবো ।
বাগানে মালিণীরা গাঁথবে মালা
ঘরে দাসিরা বাটবে চন্দন ।
তুমি বলবে, ঘুমবো ।
অমনি গাছে গাছে পাখোয়াজ তানপুরা,
অমনি জোৎস্নার ভিতরে এক লক্ষ নর্তকী ।
সুখের নাগর দোলায় এইভাবে অনেকদিন ।
তারপর
বুকের ডান পাঁজরে গর্ত খুঁড়ে খুঁড়ে
রক্তের রাঙ্গা মাটির পথে সুড়ঙ্গ কেটে কেটে
একটা সাপ
পায়ে বালুচরীর নকশা
নদীর বুকে ঝুঁকে-পড়া লাল গোধূলি তার চোখ
বিয়েবাড়ির ব্যাকুল নহবত তার হাসি,
দাঁতে মুক্তোর দানার মত বিষ,
পাকে পাকে জড়িয়ে ধরবে তোমাকে
যেন বটের শিকড়
মাটিকে ভেদ করে যার আলিঙ্গন ।
ধীরে ধীরে তোমার সমস্ত হাসির রং হলুদ
ধীরে ধীরে তোমার সমস্ত গয়নায় শ্যাওলা
ধীরে ধীরে তোমার মখমল বিছানা
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিতে, ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টিতে সাদা ।
– সেই সাপটা বুঝি তুমি ?
– না ।
– তবে ?
– স্মৃতি ।
বাসর ঘরে ঢুকার সময় যাকে ফেলে এসেছিলে
পোড়া ধুপের পাশে ।




Jibanananda Das

নির্জন স্বাক্ষর – জীবনানন্দ দাশ

তুমি তা জানো না কিছু, না জানিলে-
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য ক’রে!
যখন ঝরিয়া যাব হেমন্তের ঝড়ে,
পথের পাতার মতো তুমিও তখন
আমার বুকের ‘পরে শুয়ে রবে?
অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন
সেদিন তোমার!

তোমার এ জীবনের ধার
ক্ষয়ে যাবে সেদিন সকল?
আমার বুকের ’পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল,
তুমিও কি চেয়েছিলে শুধু তাই!-
শুধু তার স্বাদ
তোমারে কি শান্তি দেবে!

আমি ঝরে যাব, তবু জীবন অগাধ
তোমারে রাখিবে ধরে সেইদিন পৃথিবীর’ পরে-
আমার সকল গান ও তবুও তোমারে লক্ষ্য ক’রে!
রয়েছি সবুজ মাঠে-ঘাসে-
আকাশ ছড়ায়ে আছে নীল হয়ে আকাশে আকাশে।
জীবনের রঙ তবু ফলানো কি হয়
এই সব ছুঁয়ে ছেনে!-সে এক বিস্ময়
পৃথিবীতে নাই তাহা – আকাশেও নাই তার স্থল-
চেনে নাই তারে অই সমুদ্রের জল!
রাতে রাতে হেঁটে হেঁটে নক্ষত্রের সনে
তারে আমি পাই নাই, কোনো এক মানুষীর মনে
কোনো এক মানুষের তরে
যে জিনিস বেঁচে থাকে হৃদয়ের গভীর গহ্বরে!-
নক্ষত্রের চেয়ে আরো নিঃশব্দে আসনে
কোনো এক মানুষের তরে এক মানুষীর মনে!
একবার এথা ক’য়ে দেশ আর দিকের দেবতা
বোবা হয়ে পড়ে থাকে–ভুলে যায় কথা!
যে-আগুন উঠেছিল তাদের চোখের তলে জ্ব’লে
নিভে যায় — ডুবে যায় — তারা যায় স্খ’লে!
নতুন আকাঙক্ষা আসে — চলে আসে নতুন সময়
পুরনো সে নক্ষত্রের দিন শেষ হয়,
নতুনেরা আসিতেছে ব’লে!–
আমার বুকের থেকে তবুও কি পড়িয়াছে স্খ’লে
কোনো এক মানুষীর তরে
যেই প্রেম জ্বালায়েছি পুরোহিত হ’য়ে তার বুকের উপরে!
আমি সেই পুরোহিত– সেই পুরোহিত!–
যে নক্ষত্র মরে যায়, তাহার বুকের শীত
লাগিতেছে আমার শরীরে–
যেই তারা জেগে আছে, তার দিকে ফিরে
তুমি আছো জেগে–
যে আকাশে জ্বলিতেছে, তার মতো মনের আবেগে
জেগে আছো–
জানিয়াছে তুমি এক নিশ্চয়তা — হয়েছ নিশ্চয়!
হয়ে যায় আকাশের তলে কত আলো-কত আগুনের ক্ষয়;
কতবার বর্তমান হ’য়ে গেছে ব্যথিত অতীত–
তবুও তোমার বুকে লাগে নাই শীত
যে নক্ষত্র ঝরে যায় তার!
যে পৃথিবী জেগে আছে, তার ঘাস– আকাশ তোমার!
জীবনের স্বাদ লয়ে জেগে আছ– তবুও মৃত্যুর ব্যথা দিতে
পার তুমি;
তোমার আকাশের তুমি উষ্ণ হয়ে আছ, তবু–
বাহিরের আকাশের শীতে
নক্ষত্রের হইতেছে ক্ষয়,
নক্ষত্রের মতন হৃদয়
পড়িতেছে ঝ’রে–
ক্লান্ত হয়ে– শিশিরের মতো শব্দ ক’রে!
জানো নাকো তুমি তার স্বাদ,
তোমারে নিতেছে ডেকে জীবন অবাধ,
জীবন অগাধ!
হেমন্তের ঝড়ে আমি ঝরিব যখন–
পথের পাতার মতো তুমিও তখন
আমার বুকে পরে শুয়ে রবে? — অনেক ঘুমের ঘোরে ভরিবে কি মন
সেদিন তোমার!
তোমার আকাশ — আলো — জীবনের ধার
ক্ষয়ে যাবে সেদিন সকল?
আমার বুকের পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল
তুমিও কি চেয়েছিলে শুধু তাই! শুধু তার স্বাদ
তোমারে কি শান্তি দেবে!
আমি চ’লে যাব — তবু জীবন অগাধ
তোমারে রাখিবে ধরে সেই দিন পৃথিবীর প’রে;–
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য ক’রে!




Nirmolendu Gun

আমি চলে যাচ্ছি – নির্মলেন্দু গুণ

জয় করবার মতো একটি মনও যখন আর অবশিষ্ট নেই,
তখন আমার আর বসে থেকে কী প্রয়োজন? আমি যাই।
তোমরা পানপাত্র হাতে হোয়াং হো রেস্তোঁরার নির্জনতায়
মৃদু আলোর নিচে বসে মৃদুলের গান শোনো, আমি যাই।
মহাদেব-নীলা-অসীম-অঞ্জনা-কবীর-বদরুন আমি যাই,
ইয়াহিয়া, আমি চললাম। এই-যে নাসরিন, আমি আসি।

যদি কোনোদিন এই রাত্রি ভোর হয়, যদি কখনো আবার
সূর্য ওঠে রূপসী বাংলায়, আবার কখনো যদি ফিরে পাই
আমার যৌবন, যদি পাই অনন্ত স্বপ্নের মতো নারী, কবি
না হয়ে, অন্য যা-কিছু হয়ে আমি ফিরে আসতেও পারি।

অভিভূত কবির মতন নারীকে আমি ভালোবেসেছিলাম।
সুচিত্রা সেনের মতো অপরূপা, বিদুষী-সুন্দরী ছিল তারা,
তাদের দেহে স্বর্গের লাবণ্য ছিল কিন্তু হৃদয় ছিল ঘাস।
আমার প্রেম নিয়ে তারা কত রকমের যে রহস্য করেছে-
গাধা ভেবে কেউবা নাকের ডগায় ঝুলিয়ে দিয়েছে মুলো;
কেউবা উরাত দেখিয়ে-দেখিয়ে কাটিয়েছে কাল। তারপর
একদিন সর্পচর্মবৎ আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে চলে গেছে
দূরে। আমি নিঃস্ব গৃহকোণে, তারা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বে।
অথচ তাদের কথা ভেবে আমি কেঁদেছি নিদ্রায়-জাগরণে।
এখন আমারও হৃদয়ে আর প্রেম নেই, ভালোবাসা নেই,
বাসনার আলোড়ন নেই, আজ আমারও হৃদয়ে শুধু ঘাস,
শুধু স্মৃতি, শুধু স্মৃতি, শুধু স্মৃতি আর স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস।

জয় করবার মতো একটি মনও যখন আর অবশিষ্ট নেই,
তখন আর আমার বসে থেকে কী প্রয়োজন? আমি আর
কতো ভালোবাসবো? আর কার জন্যে অপেক্ষা আমার?
তার চেয়ে এই কি যথার্থ নয়? আমি খুব দূরে চলে যাই।

যদি কোনোদিন এই রাত্রি ভোর হয়, আবার কখনো যদি
সূর্য ওঠে নিষ্ঠুর বাংলায়, আবার কখনও যদি ফিরে পাই
আমার যৌবন, যদি পাই আমার স্বপ্নের সেই নারী, কবি
না হয়ে, অন্য যা-কিছু হয়ে আমি ফিরে আসতেও পারি।

তোমরা পানপাত্র হাতে হোয়াং হো রেস্তোঁরার নির্জনতায়
মৃদু আলোর নিচে বসে মৃদুলের গান শোনো, আমি চলি।
মহাদেব-নীলা-অসীম-অঞ্জনা-কবীর-বদরুন, আমি যাই,
ইয়াহিয়া, আমি চললাম। এই-যে নাসরিন, আমি আসি।




Nirmolendu Gun

আমাকে কী মাল্য দেবে, দাও – নির্মলেন্দু গুণ

তোমার পায়ের নিচে আমিও অমর হব,
আমাকে কী মাল্য দেবে, দাও।
এই নাও আমার যৌতুক, এক-বুক রক্তের প্রতিজ্ঞা।
ধুয়েছি অস্থির আত্মা শ্রাবণের জলে, আমিও প্লাবন হব,
শুধু চন্দনচর্চিত হাত একবার বোলাও কপালে।

আমি জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে উড়াব গাণ্ডীব,
তোমার পায়ের কাছে নামাব পাহাড়।
আমিও অমর হব, আমাকে কী মাল্য দেবে, দাও।
পায়ের আঙুল হয়ে সারাক্ষণ লেগে আছি পায়ে,
চন্দনের ঘ্রাণ হয়ে বেঁচে আছি কাঠের ভিতরে।

আমার কিসের ভয় ?
কবরের পাশে থেকে হয়ে গেছি নিজেই কবর,
শহীদের পাশে থেকে হয়ে গেছি নিজেই শহীদ,
আমার আঙুল যেন শহীদের অজস্র মিনার হয়ে
জনতার হাতে হাতে গিয়েছে ছড়িয়ে।
আমার কিসের ভয় ?
তোমার পায়ের নিচে আমিও অমর হব,
আমাকে কী মাল্য দেবে, দাও
এই দেখো অন্তরাত্মা মৃত্যুর গর্বে ভরপুর,
ভোরের শেফালি হয়ে পড়ে আছে ঘাসে।
আকন্দ-ধুন্দুল নয়, রফিক-সালাম-বরকত-আমি;
আমারই আত্মার প্রতিভাসে এই দেখ আগ্নেয়াস্ত্র,
কোমরে কার্তুজ, অস্থি ও মজ্জার মধ্যে আমার বিদ্রোহ,
উদ্ধত কপাল জুড়ে যুদ্ধের এ-রক্তজয়টিকা।
আমার কিসের ভয় ?
তোমার পায়ের নিচে আমিও কবর হব,
আমাকে কী মাল্য দেবে, দাও।




Nirmolendu Gun

ভালোবাসা, ভারসাম্যহীন – নির্মলেন্দু গুণ

বাঁশির কাছে যে-সুরের প্রত্যাশা
সে-প্রত্যাশা পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত
আমি আমার বাঁশিটি বাজাতে চাই।
যে-পর্যন্ত স্থলিত হয়না বীর্য
সে-পর্যন্ত জীবের সঙ্গম।
জয়ী না-হওয়া পর্যন্ত
আমি পরাভাবকে স্বীকার করি না।

ভালো না-বেসেই যদি ভালোবাসা পাই।
ভাবি, কী লাভ তাহলে পণ্ড শ্রমে?
যে-প্রেম ফাঁকি দিতে জানে
তার বাকি শোধ হয় না জীবনে।
যে-প্রেমে ঘাটতি নেই
সে-তো বুদ্ধিমান গৃহীর প্রণয়-
সে আমার নয়।

আমার ভালোবাসা ভারসাম্যহীন,
উঁচু-নিচু, ভাঙা-চোরা, খানাখন্দময়।




Nirmolendu Gun

মুখোমুখি – নির্মলেন্দু গুণ

তাড়াতে তাড়াতে তুমি কতদূর নেবে?
এই তো আবার আমি ফিরে দাঁড়িয়েছি ।

জীবনের নশ্বর শরীর ছুঁয়ে যে বালক
একদিন উত্তাল নদীর জলে ঝাঁপ দিয়েছিল,
সাপের ফণায় তার কচি হাত রেখে যে বালক
বলেছিল মনসাকে আমি না কখনো;
তাড়াতে তাড়াতে সাপ কতদূর নেবে তাকে?
এই তো আবার আমি ফিরে দাঁড়িয়েছি।

রৌদ্র যার বন্ধু ছিল, বৃষ্টি যার গোপন-প্রেমিকা,
অগ্নি যার বুকের উদ্ভাস, বাংলার মাটির ছুঁয়ে
সে এখন প্রতিবাদী মুখোমুখি দুরন্ত যুবক।
তাড়াতে তাড়াতে তুমি কতদূর নেবে তাকে?
এই তো আবার আমি ফিরে দাঁড়িয়েছি।

আশৈশব স্বাধীনতার লোভে যে যুবক
হিংসাহীন প্রেমের বিক্ষোভে বলেছিলঃ
‘যুদ্ধ নয়, ভালোবেসে জিতে নেবো তারে’
মানুষের মৃত হাড়ে সে এখন সশস্ত্র সন্ত্রাস ।
তাড়াতে তাড়াতে তুমি কতদূর নেবে তাকে?
এই তো আবার আমি ফিরে দাঁড়িয়েছি ।




Nirmolendu Gun

আগ্নেয়াস্ত্র – নির্মলেন্দু গুণ

পুলিশ স্টেশনে ভিড়,আগ্নেয়াস্ত্র জমা নিচ্ছে শহরের
সন্দিগ্ধ সৈনিক।সামরিক নির্দেশে ভীত মানুষের
শটগান,রাইফেল,পিস্তল এবং কার্তুজ,যেন দরগার
স্বীকৃত মানত,টেবিলে ফুলের মতো মস্তানের হাত।

আমি শুধু সামরিক আদেশ অমান্য করে হয়ে গেছি
কোমল বিদ্রোহী,প্রকাশ্যে ফিরছি ঘরে
অথচ আমার সঙ্গে হৃদয়ের মতো মারাত্তক
একটি আগ্নেয়াস্ত্র,আমি জমা দেইনি।




Nirmolendu Gun

আবার যখনই দেখা হবে – নির্মলেন্দু গুণ

আবার যখনই দেখা হবে, আমি প্রথম সুযোগেই
বলে দেব স্ট্রেটকাটঃ ‘ভালোবাসি’।
এরকম সত্য-ভাষণে যদি কেঁপে ওঠে,
অথবা ঠোঁটের কাছে উচ্চারিত শব্দ থেমে যায়,
আমি নখাগ্রে দেখাবো প্রেম, ভালোবাসা, বক্ষ চিরে
তোমার প্রতিমা। দেয়ালে টাঙ্গানো কোন প্রথাসিদ্ধ
দেবীচিত্র নয়, রক্তের ফ্রেমে বাঁধা হৃদয়ের কাচে
দেখবে নিজের মুখে ভালোবাসা ছায়া ফেলিয়াছে।

এরকম উন্মোচনে যদি তুমি আনুরাগে মুর্ছা যেতে চাও
মূর্ছা যাবে,জাগাবো না,নিজের শরীর দিয়ে কফিন বানাবো।

‘ভালোবাসি’ বলে দেব স্ট্রেটকাট, আবার যখনই দেখা হবে।




Jibanananda Das

এই জল ভালো লাগে – জীবনানন্দ দাশ

এই জল ভালো লাগে; বৃষ্টির রূপালি জল কত দিন এসে
ধুয়েছে আমার দেহ — বুলায়ে দিয়েছে চুল — চোখের উপরে
তার শান — স্নিগ্ধ হাত রেখে কত খেলিয়াছে, — আবেগের ভরে
ঠোঁটে এসে চুমা দিয়ে চলে গেছে কুমারীর মতো ভালোবেসে;
এই জল ভালো লাগে; — নীলপাতা মৃদু ঘাস রৌদ্রের দেশে
ফিঙ্গা যেমন তার দিনগুলো ভালোবাসে — বনের ভিতর

বার বার উড়ে যায়, — তেমনি গোপন প্রেমে এই জল ঝরে
আমার দেহের পরে আমার চোখের পরে ধানের আবেশে
ঝরে পড়ে; — যখন অঘ্রাণ রাতে ভরা ক্ষেত হয়েছে হলুদ,
যখন জামের ডালে পেঁচার নরম হিম গান শোনা যায়,
বনের কিনারে ঝরে যেই ধান বুকে করে শান — শালিখুদ,
তেমনি ঝরিছে জল আমার ঠোঁটের পরে চোখের পাতায় –
আমার চুলের পরে, — অপরাহ্নে রাঙা রোদে সবুজ আতায়
রেখেছে নরম হাত যেন তার — ঢালিছে বুকের থেকে দুধ।